মন্দের ভালো- বলে বাংলায় একটা কথা আছে। গণতন্ত্রের গুনগান করতে গিয়ে এর চেয়ে ভালো কোন উপমা পাওয়া মুশকিল। গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা মাত্র। কোন পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান নয়। আভিধানিক অর্থে গণতন্ত্র বলতে বোঝায় ‘জনগণের শাসন’। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো অবশ্য গণতন্ত্রকে বলেছেন, মূর্খের শাসন। তারপরও এর চেয়ে উত্তম কোন শাসন ব্যবস্থা পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত নাই। গণতন্ত্রের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞাটি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। ১৯ নভেম্বর, ১৮৬৩ সালে তাঁর গেটিসবার্গ বক্তৃতায়। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র হলো- জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের সরকার।” গণতন্ত্রে জনগণ ভোট দিয়ে তার প্রতিনিধি নির্বাচিত করে শাসন কাজে অংশগ্রহণ করে।
গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসির উৎপত্তি খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে গ্রিসের নগর রাষ্ট্র এথেন্সে। আর বর্তমানে প্রচলিত সংসদীয় গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে। সেখানে দীর্ঘ ২৩ বছরের ( ১৬৮৮ থেকে ১৭১১ সাল) গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লবের পটভূমিতে এর জন্ম। এই বিপ্লব ছিল যুক্তির। যুক্তি জয়যুক্ত হয়ে নিরুঙ্কুস রাজতন্ত্রকে হটিয়ে গণতন্ত্রকে ভূমিষ্ঠ করেছিল। তাই ইংল্যান্ডকে গণতন্ত্রের মাতৃভূমি বলা হয়। এরপর, সামাজিক নিরাপত্তা, কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার মতো বিষয়গুলির ন্যায় গণতন্ত্রও সারা বিশ্বে প্রসার লাভ করার ক্ষেত্রে আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছে।
নির্বাচন গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। আমাদের দেশে নির্বাচনতো উৎসবের মতো। বাংলাদেশে নির্বচনের দিনটিকে ঈদের দিন, পূজার দিন, বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন বা বিশেষ কোন উৎসবের দিন থেকে বিশেষভাবে আলাদা করা যায় না। সুন্দর জামাকাপড় পড়ে ভোটের দিন ভোটাররা কেন্দ্রে যায়। শিশুরাও এই ভোটদান উৎসবে শামিল হয়। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য হলো ছেলের পিঠে চড়ে বৃদ্ধ বাবা-মা’র ভোট দিতে যাওয়া। পত্রিকার পাতায় এরকম ছবি চোখে জল এনে দেয়। ভোটের প্রচারনার দিনগুলো ও ভোটের দিন চারপাশে উৎসব-উৎসব পরিবেশ বিরাজ করে। উৎসবের এই আমেজ ভোটের দিনটি গেলেই শেষ।
নির্বাচন শেষে নির্বাচিতরা পরিণত হয় বিশেষ এক শ্রেণীতে। এদেরকে পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে সকলে তোয়াজ করা শুরু করে। জনগণের প্রতিনিধি বলে কথা! তোয়াজ ও তোষামোদিতে নির্বাচিতরা পরিণত হয় সামান্তযুগের জমিদার বা রাজা-বাদশায়। স্বৈরাচার এরশাদ সম্পর্কে উত্তর বঙ্গের সাধারণ মানুষের অসাধারণ চাওয়া-মোগো পোওয়া আজা হবো। সত্যি মনে হয়। সাধারণ জনগণ পড়ে থাকে, যে তীমিরে সে ছিল সেই তীমিরেই। আবার শুরু হয় পাঁচ বছর পর বিশেষ দিনটির জন্য ক্ষণগননা।
আমাদের এতো আবেগের গণতন্ত্র নিয়ে কিন্তু অভিযোগের শেষ নেই। বাম গণতান্ত্রিক জোটের ভাষায় বিদ্যমান গণতন্ত্র হলো,‘ স্বৈরাতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের’ ব্যবস্থা। ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট(ইআইইউ) এর বৈশ্বিক প্রতিবেদন মতে,‘হাইব্রিড গণতন্ত্র’। যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের পলিটিক্স গ্রন্থ পড়েন তাহলে আপনি রাজততন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, স্বৈরাতন্ত্র, কতিপয় তন্ত্র আর আমাদের গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পেতে খেয় হারিয়ে ফেলবেন।
বর্তমান গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো- এটা একদিনের গণতন্ত্র। ভোটের দিন ভোটদানই মুখ্য। আর কোথাও গণতন্ত্র নেই। ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রচলিত আছে ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’। একথা যারা বলেন তাদের আপনি সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু তাদের যুক্তিকে আপনি একেবারে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। কমোনওয়েলথভুক্ত দেশেগুলোর মতো ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতির সংসদীয় গণতন্ত্র আমাদের দেশেও প্রচলিত আছে। যদি লক্ষ্য করেন, এই পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদে কে কোথায় আসন গ্রহণ করবেন-এই নিয়মটা মানা ছাড়া আর অন্য কোন আচার মানার সংস্কৃতি আছে কদাচিৎ।
এর অন্যতম কারণ হলো, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। গণতন্ত্রের নামে কিছু কালো টাকার মালিক দুর্বৃত্তের হাতে দেশের সাধারণ জনগণ বন্দী। দুর্বল রাজনীতির সুযোগ নিয়ে আমলারাও জনগণের ঘাড়ে চেপে বসার সুযোগের সন্ধানে আছে। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে এমনটা প্রায় বলা হয়। নির্বাচন মানে অনেক টাকার খেলা। রাজনীতিতে টাকাই হলো-শেষ কথা। আর জনগণের ক্ষমতায়ন হলো-কথার কথা। জনগণের ক্ষমতায়ন ও কালো টাকার দ্বৈরথে জনগণ হেরে যায় সবসময়।
বিদ্যমান ব্যবস্থা যদি বিবেচনায় নেন। দেখবেন, আমাদের সংবিধানের ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এবং ১১ ধারায় উল্লেখ আছে, প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র... এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে। ভালো কথা। এখন প্রশ্ন হলো, এই যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কথা এখানে বলা হয়েছে, তারা কী স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। ধারা ৭০(খ) লক্ষ্য করেন। এখানে বলা হয়েছে, কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূণ্য হইবে। এরকম একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় আমার আপনার প্রতিনিধি স্বাধীনভাবে কাজ করবেন কিভাবে?
সংসদীয় পদ্ধতিতে মন্ত্রিপরিষদ একটি অনন্য সত্তা। এখানে সকল সদস্য সমান আর প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রথম। সংবিধানের ৫৫(৩) ধারায় বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন। বিষয়টি তাহলে কী দাঁড়ালো? আপনি একজনকে হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়ে বললেন সাঁতরাও। একজন সাংসদ তার স্বীয় পদ হারানোর ভয় আর ভবিষ্যতে নমিনেশন না পাওয়ার শঙ্কা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সভাসদদের জবাবদিহিতার জন্য লড়াই করবে?
জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারতো কর্তত্বপরায়ণ হবেই। এ সমস্য শুধু আমাদের একার না। পৃথিবী জুড়ে অবস্থা প্রায় একই রকম। উগ্র জাতীয়তাবাদী, মৌলবাদী ও চরমভাবাপন্ন নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত দেশে দেশে। তবে, দেশে জাতীয় পর্যায়ের সম্পাদকদের রাস্তায় নেমে মানব বন্ধন আপনার মনে ভীতি ধরানোর জন্য যথেষ্ঠ। দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগা অমূলক নয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে মুক্ত চিন্তা ও জীবনের জন্য যে হাওয়া বদল, দিন বদল তা আপনার মনে হতে পারে, নকল। বিশেষ একটি শ্রেণীর ভাগ্যবদল হলো, আসল। আর এটাই শেষ কথা।
শেষ কথারও পরে কথা থাকে। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা চাইলেই দেখানো যায়। তা গণতন্ত্রে আবশ্যক। বাস্তবে তেলে জলে কখনও মেশে না। আমাদের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের অবস্থা ঠিক সেরকম। মতামতের কথা বাদই দেন। অতীত ইতিহাস সাক্ষ দেয়, তারা কার্যত এক দল অপর দলকে নিশ্চিন্ন ও নেতৃত্ব শুণ্য করতে চায়। এই সুয়োগে একদল সুয়োগ সন্ধানী, ‘মাইনাস টু একটি মূলদ না অমূলদ সংখ্যা’-অংকটির সমাধান করার জন্য সবসময় ওতপেতে থাকে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে এদের তৎপরতা বেড়ে যায়। নির্বাচনের আগে আগে দেশে গণতন্ত্রকে বড় বেশী নড়বড়ে মনে হয়।
গণতন্ত্রের এই নড়বড়ে অবস্থা যে শুধু আমাদের দেশে, তা কিন্তু না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর গণতন্ত্র রপ্তানিকারক আমেরিকাতেও গণতন্ত্রেও বারটা বাজার দশা। সাবেক ফাস্ট লেডি মিশেল ওবামা সাম্প্রতি তাঁর এক বক্তৃতিতায় বলেছেন,‘ আপনাকে সাথে নিয়ে আথবা বাদ দিয়ে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকবে।’ তিনি শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের কথায় বলেছেন। আর আমরা মূল গণতন্ত্রের কথা বাদ দিয়ে, আমদানি করা গণতান্ত্রিক মডেলের কথা বারবার শুনছি। মালায়েশিয়া বা জাপান মডেলের গণতন্ত্র ভালো না খারাপ তা নির্ণয় করবে জনগণ । তার আগে গণতন্ত্রতো থাকতে হবে। আসলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যদি গণতন্ত্রের মূল্যবোধগুলোর চর্চা করা না যায় তাহলে সবজায়গায় ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি হবে। নিন্দুকেরা গণতন্ত্রকে একদিনের গণতন্ত্র বা নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র নির্বাচনের ব্যবস্থা বলে সমালোচনা করার সুযোগ পাবেই।
শেষ কথা হলো, গণতন্ত্র একটি সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো। নানান আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্য দিয়ে সে জন্ম লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে সে শৈশব-কৌশর পার করে যৌবনপ্রপ্ত হয় ও পরিণতের পথে এগিয়ে যায়। তবে মানব শিশুর মতো সেও অকালেই ঝরে যেতে পারে। কিভাবে গণতন্ত্র মারা যায়? এ বিষয়ে বিশদ আলোচনার অবকাশ থেকেই যায়।