সোমবার, ২৯ অক্টোবর, ২০১৮

একদিনের গণতন্ত্র

মন্দের ভালো- বলে বাংলায় একটা কথা আছে। গণতন্ত্রের গুনগান করতে গিয়ে এর চেয়ে ভালো কোন উপমা পাওয়া মুশকিল। গণতন্ত্র একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা মাত্র। কোন পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান নয়। আভিধানিক অর্থে গণতন্ত্র বলতে বোঝায় ‘জনগণের শাসন’। গ্রিক দার্শনিক প্লেটো অবশ্য গণতন্ত্রকে বলেছেন, মূর্খের শাসন। তারপরও এর চেয়ে উত্তম কোন শাসন ব্যবস্থা পৃথিবীতে এখন পর্যন্ত নাই। গণতন্ত্রের সবচেয়ে সুন্দর সংজ্ঞাটি দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকন। ১৯ নভেম্বর, ১৮৬৩ সালে তাঁর গেটিসবার্গ বক্তৃতায়। তিনি বলেন, “গণতন্ত্র হলো- জনগণের জন্য, জনগণের দ্বারা, জনগণের সরকার।” গণতন্ত্রে জনগণ ভোট দিয়ে তার প্রতিনিধি নির্বাচিত করে শাসন কাজে অংশগ্রহণ করে। 

গণতন্ত্র বা ডেমোক্রেসির উৎপত্তি খ্রিষ্টপূর্ব ৫ম শতকে গ্রিসের নগর রাষ্ট্র এথেন্সে। আর বর্তমানে প্রচলিত সংসদীয় গণতন্ত্রের গোড়াপত্তন ইংল্যান্ডে ১৬৮৮ সালে। সেখানে দীর্ঘ ২৩ বছরের ( ১৬৮৮ থেকে ১৭১১ সাল) গৌরবোজ্জ্বল বিপ্লবের পটভূমিতে এর জন্ম। এই বিপ্লব ছিল যুক্তির। যুক্তি জয়যুক্ত হয়ে নিরুঙ্কুস রাজতন্ত্রকে হটিয়ে গণতন্ত্রকে ভূমিষ্ঠ করেছিল। তাই ইংল্যান্ডকে গণতন্ত্রের মাতৃভূমি বলা হয়। এরপর, সামাজিক নিরাপত্তা, কল্যাণ রাষ্ট্রের ধারণার মতো বিষয়গুলির ন্যায় গণতন্ত্রও সারা বিশ্বে প্রসার লাভ করার ক্ষেত্রে আমেরিকা বা যুক্তরাষ্ট্র বাতিঘর হিসেবে কাজ করেছে।  

নির্বাচন গণতন্ত্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অনুসঙ্গ। আমাদের দেশে নির্বাচনতো উৎসবের মতো। বাংলাদেশে নির্বচনের দিনটিকে ঈদের দিন, পূজার দিন, বড়দিন, বুদ্ধ পূর্ণিমার দিন বা বিশেষ কোন উৎসবের দিন থেকে বিশেষভাবে আলাদা করা যায় না। সুন্দর জামাকাপড় পড়ে ভোটের দিন ভোটাররা কেন্দ্রে যায়। শিশুরাও এই ভোটদান উৎসবে শামিল হয়। সবচেয়ে আবেগঘন দৃশ্য হলো ছেলের পিঠে চড়ে বৃদ্ধ বাবা-মা’র ভোট দিতে যাওয়া। পত্রিকার পাতায় এরকম ছবি চোখে জল এনে দেয়। ভোটের প্রচারনার দিনগুলো ও ভোটের দিন চারপাশে উৎসব-উৎসব পরিবেশ বিরাজ করে। উৎসবের এই আমেজ ভোটের দিনটি গেলেই শেষ। 

নির্বাচন শেষে নির্বাচিতরা পরিণত হয় বিশেষ এক শ্রেণীতে। এদেরকে পুলিশ-প্রশাসন থেকে শুরু করে সকলে তোয়াজ করা শুরু করে। জনগণের প্রতিনিধি বলে কথা! তোয়াজ ও তোষামোদিতে নির্বাচিতরা পরিণত হয় সামান্তযুগের জমিদার বা রাজা-বাদশায়। স্বৈরাচার এরশাদ সম্পর্কে উত্তর বঙ্গের সাধারণ মানুষের অসাধারণ চাওয়া-মোগো পোওয়া আজা হবো। সত্যি মনে হয়। সাধারণ জনগণ পড়ে থাকে, যে তীমিরে সে ছিল সেই তীমিরেই। আবার শুরু হয় পাঁচ বছর পর বিশেষ দিনটির জন্য ক্ষণগননা।  

আমাদের এতো আবেগের গণতন্ত্র নিয়ে কিন্তু অভিযোগের শেষ নেই। বাম গণতান্ত্রিক জোটের ভাষায় বিদ্যমান গণতন্ত্র হলো,‘ স্বৈরাতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের’ ব্যবস্থা। ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট(ইআইইউ) এর বৈশ্বিক প্রতিবেদন মতে,‘হাইব্রিড গণতন্ত্র’। যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞানের জনক এরিস্টটলের পলিটিক্স গ্রন্থ পড়েন তাহলে আপনি রাজততন্ত্র, অভিজাততন্ত্র, স্বৈরাতন্ত্র, কতিপয় তন্ত্র আর আমাদের গণতন্ত্রের মধ্যে পার্থক্য খুঁজে পেতে খেয় হারিয়ে ফেলবেন।     
     
বর্তমান গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো- এটা একদিনের গণতন্ত্র। ভোটের দিন ভোটদানই মুখ্য। আর কোথাও গণতন্ত্র নেই। ১৯৯১ সালের পর থেকে প্রচলিত আছে ‘নির্বাচনী গণতন্ত্র’। একথা যারা বলেন তাদের আপনি সমালোচনা করতে পারেন। কিন্তু তাদের যুক্তিকে আপনি একেবারে উড়িয়ে দিতে পারবেন না। কমোনওয়েলথভুক্ত দেশেগুলোর মতো ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতির সংসদীয় গণতন্ত্র আমাদের দেশেও প্রচলিত আছে। যদি লক্ষ্য করেন, এই পদ্ধতিতে জাতীয় সংসদে কে কোথায় আসন গ্রহণ করবেন-এই নিয়মটা মানা ছাড়া আর অন্য কোন  আচার মানার সংস্কৃতি আছে কদাচিৎ। 

এর অন্যতম কারণ হলো, রাজনীতি রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। গণতন্ত্রের নামে কিছু কালো টাকার মালিক দুর্বৃত্তের হাতে দেশের সাধারণ জনগণ বন্দী। দুর্বল রাজনীতির সুযোগ নিয়ে আমলারাও জনগণের ঘাড়ে চেপে বসার সুযোগের সন্ধানে আছে। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে  এমনটা প্রায় বলা হয়। নির্বাচন মানে অনেক টাকার খেলা। রাজনীতিতে টাকাই হলো-শেষ কথা। আর জনগণের ক্ষমতায়ন হলো-কথার কথা। জনগণের ক্ষমতায়ন ও কালো টাকার দ্বৈরথে জনগণ হেরে যায় সবসময়। 

বিদ্যমান ব্যবস্থা যদি বিবেচনায় নেন। দেখবেন, আমাদের সংবিধানের ৭(১) ধারায় বলা হয়েছে, প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। এবং ১১ ধারায় উল্লেখ আছে, প্রজাতন্ত্র হইবে একটি গণতন্ত্র... এবং প্রশাসনের সকল পর্যায়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মাধ্যমে জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হইবে। ভালো কথা। এখন প্রশ্ন হলো, এই যে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কথা এখানে বলা হয়েছে, তারা কী স্বাধীনভাবে কাজ করতে সক্ষম। ধারা ৭০(খ) লক্ষ্য করেন। এখানে বলা হয়েছে, কোন নির্বাচনে কোন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোন ব্যক্তি সংসদ-সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি- সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোটদান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূণ্য হইবে। এরকম একটি সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতায় আমার আপনার প্রতিনিধি স্বাধীনভাবে কাজ করবেন কিভাবে?

সংসদীয় পদ্ধতিতে মন্ত্রিপরিষদ একটি অনন্য সত্তা। এখানে সকল সদস্য সমান আর প্রধানমন্ত্রী হলেন প্রথম। সংবিধানের ৫৫(৩) ধারায় বলা হয়েছে, মন্ত্রিসভা যৌথভাবে সংসদের নিকট দায়ী থাকিবেন। বিষয়টি তাহলে কী দাঁড়ালো? আপনি একজনকে হাত-পা বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়ে বললেন সাঁতরাও। একজন সাংসদ তার স্বীয় পদ হারানোর ভয় আর ভবিষ্যতে নমিনেশন না পাওয়ার শঙ্কা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও তার সভাসদদের জবাবদিহিতার জন্য লড়াই করবে? 

জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা না গেলে সরকারতো কর্তত্বপরায়ণ হবেই। এ সমস্য শুধু আমাদের একার না। পৃথিবী জুড়ে অবস্থা প্রায় একই রকম। উগ্র জাতীয়তাবাদী, মৌলবাদী ও চরমভাবাপন্ন নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত দেশে দেশে। তবে, দেশে জাতীয় পর্যায়ের সম্পাদকদের রাস্তায় নেমে মানব বন্ধন আপনার মনে ভীতি ধরানোর জন্য যথেষ্ঠ। দেশে স্বাধীন গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন জাগা অমূলক নয়। গণতান্ত্রিক পরিবেশে মুক্ত চিন্তা ও জীবনের জন্য যে হাওয়া বদল, দিন বদল তা আপনার মনে হতে পারে, নকল। বিশেষ একটি শ্রেণীর ভাগ্যবদল হলো, আসল। আর এটাই শেষ কথা। 

শেষ কথারও পরে কথা থাকে। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা চাইলেই দেখানো যায়। তা গণতন্ত্রে আবশ্যক। বাস্তবে তেলে জলে কখনও মেশে না। আমাদের প্রধান দু’টি রাজনৈতিক দলের অবস্থা ঠিক সেরকম। মতামতের কথা বাদই দেন। অতীত ইতিহাস সাক্ষ দেয়, তারা কার্যত এক দল অপর দলকে নিশ্চিন্ন ও নেতৃত্ব শুণ্য করতে চায়। এই সুয়োগে একদল সুয়োগ সন্ধানী, ‘মাইনাস টু একটি মূলদ না অমূলদ সংখ্যা’-অংকটির সমাধান করার জন্য সবসময় ওতপেতে থাকে। নির্বাচন ঘনিয়ে আসলে এদের তৎপরতা বেড়ে যায়। নির্বাচনের আগে আগে দেশে গণতন্ত্রকে বড় বেশী নড়বড়ে মনে হয়। 

গণতন্ত্রের এই নড়বড়ে অবস্থা যে শুধু আমাদের দেশে, তা কিন্তু না। ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর গণতন্ত্র রপ্তানিকারক আমেরিকাতেও গণতন্ত্রেও বারটা বাজার দশা। সাবেক ফাস্ট লেডি মিশেল ওবামা সাম্প্রতি তাঁর এক বক্তৃতিতায় বলেছেন,‘ আপনাকে সাথে নিয়ে আথবা বাদ দিয়ে গণতন্ত্র অব্যাহত থাকবে।’ তিনি শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের কথায় বলেছেন। আর আমরা মূল গণতন্ত্রের কথা বাদ দিয়ে, আমদানি করা গণতান্ত্রিক মডেলের কথা বারবার শুনছি। মালায়েশিয়া বা জাপান মডেলের গণতন্ত্র ভালো না খারাপ তা নির্ণয় করবে জনগণ । তার আগে গণতন্ত্রতো থাকতে হবে। আসলে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে যদি গণতন্ত্রের মূল্যবোধগুলোর চর্চা করা না যায় তাহলে সবজায়গায় ভারসাম্যহীন অবস্থার সৃষ্টি হবে। নিন্দুকেরা গণতন্ত্রকে একদিনের গণতন্ত্র বা নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র নির্বাচনের ব্যবস্থা বলে সমালোচনা করার সুযোগ পাবেই।

শেষ কথা হলো, গণতন্ত্র একটি সদ্য ভূমিষ্ঠ শিশুর মতো। নানান আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্য দিয়ে সে জন্ম লাভ করে। এরপর ধীরে ধীরে সে শৈশব-কৌশর পার করে যৌবনপ্রপ্ত হয় ও পরিণতের পথে এগিয়ে যায়। তবে মানব শিশুর মতো সেও অকালেই ঝরে যেতে পারে। কিভাবে গণতন্ত্র মারা যায়? এ বিষয়ে বিশদ আলোচনার অবকাশ থেকেই যায়।   




মঙ্গলবার, ২৩ অক্টোবর, ২০১৮

সবাই কেন এমপি হতে চায়?

একাদশ সংসদ নির্বাচন আসন্ন। রাজনীতির মাঠ এখন কিছুটা শান্ত। ঝড়ের পূর্বে যেমন প্রকৃতিতে নিরবতা নেমে আসে, অবস্থা ঠিক সেরকম। নভেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনী তফসিল ঘোষিত হবে। ক্ষমতাসীন সরকারের বিরোধিরা তফসিল ঘোষণার প্রহর গুনছেন। তফসিল ঘোষিত হলে তারা মাঠে নামবে। জাতীয় ঐক্যের কথা বলে, তারা আপাতত নির্বাচনী আলোচনায় আছে। অপরদিকে, সরকারি দলের বর্তমান সাংসদগণ ও গ্রীণ কিংবা হলুদ সিগনাল পাওয়া সম্ভাব্য প্রর্থীগণ তাদের নির্বাচনী এলাকায় নির্বাচনী প্রচারে ব্যস্ত সময় পার করছেন। আর নির্বচনের মূল শক্তি ক্ষমতার উৎস ভোটারগণ পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করছেন। জাতীয় নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন। ভোট দিয়ে তারা তাদের প্রতিনিধি হিসেবে ৩০০ জন সাংসদ নির্বাচিত করবেন। এই নির্বাচিত ৩০০ জন আরও ৫০ জন সংরক্ষিত নারী সংসদ সদস্য নির্বাচিত করবেন। সর্বমোট ৩৫০ জন সংসদ সদস্য নিয়ে জাতীয় সংসদ গঠিত হবে। 

এখন দেশের সবখানে নির্বাচন ও রাজনীতি নিয়ে কথা হচ্ছে। সম্প্রতি আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তনে বিভিন্ন পেশাজীবীদের রাজনৈতিক অভিলাষের কথা খোলামেলাভাবে বলেছেন। তিনি বলেছেন, “প্রত্যেকেই রিটায়ার কইরা বলে, ‘আমি রাজনীতি করিব’।” আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি যথার্থই বলেছেন। এদেশে সাধারণ প্রবনতা হলো, সবাই রাজনীতি করতে চাই। আর বর্তমান সময়ে সবাই এমপি হতে চাই, একথা বললে বোধ হয় বাড়িয়ে বলা হবে না। 

এমপি-মেম্বার অব পার্লামেন্ট বা মেম্বার অব দ্য লেজিসলেটিভ এসেম্বলি( এমএলএ ) এর বাংলা প্রতিশব্দ হলো সংসদ সদস্য। সংসদ সদস্যদের সংক্ষেপে ‘সাংসদ’ আর ফরাসি ভাষায় ‘ডেপুটি’ নামে অভিহিত করা হয়। আমাদের দেশের ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুসারে সবার উপরে এক নম্বরে আছেন রাষ্ট্রপতি এরপর দুই নম্বরে প্রধানমন্ত্রী। সাংসদ বা এমপিদের অবস্থান ১৩ নম্বরে। মহামান্য রাষ্ট্রপতি সেনা প্রধান, পুলিশের আইজিসহ যেসব পেশাজীবীদের কথা তাঁর সমাবর্তন বক্তৃতায় উল্লেখ করেছেন, তারা সবাই তাদের চাকুরী জীবনে পদামর্যাদার ক্রমানুসরে ১৩ নম্বরের উপরে অবস্থান করেছেন। তাহলে অবসরের পর কেন তারা নিচে নামতে চান? কী সেই রহস্য? কেন এই প্রবণতা? শিল্পপতি-ভগ্নিপতি, আমলা থেকে কামলা, রাজনীতিবিদ থেকে পীর, নায়ক-নায়িকা থেকে ভিলেন, মৌলভী থেকে মাদক ব্যবসায়ী সবাই কেন এমপি হতে চাই?    

একজন সংসদ সদস্যের বিধিবদ্ধ দায়িত্ব যদি আপনি লক্ষ্য করেন। তাহলে দেখবেন, তাঁর দ্বায়িত্ব হলো- তিনি নিয়মিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে যোগ দিয়ে কার্যবিধি অনুসারে দায়িত্ব পালন করবেন। তিনি আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে সংসদে বিল উত্থাপন করতে পারবেন ও অন্যের আনিত বিলে ভোট দিতে পারবেন। ১৫ দিনের নোটিসসাপেক্ষে সংসদ অধিবেশনে প্রশ্ন উপস্থাপন করতে পারবেন। স্পিকারের অনুমোদন সাপেক্ষে সংসদে জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণমূলক বক্তব্য দিতে পারবেন। তাহলে মূল বিষয়টি দাঁড়ালো, আইন প্রণয়নই একজন এমপির মূল কাজ। আইন সকলের জন্য সমান। তাহলে নিজের খেয়ে এতো টাকাপয়সা খরচ করে, কেন সবাই বনের মোষ তাড়াতে চায়?

এ ব্যাপারে আপনি সাধারণ মানুষের সাথে বলেন। সাধারণ মানুষ  আপনাকে অসাধারণ ব্যাখ্যা দেবে। তাদের কথার সারমর্ম করলে যে মর্মার্থ দাঁড়াবে তাহলো, আমাদের দেশে নির্বাচন মানে অনেক টাকার ব্যাপার। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ইলেকশন করতে এখন মোটামুটি অর্ধ কোটি টাকার কম নিয়ে নামলে হয় না। আর এমপি নির্বাচনের কথাতো বাদিই দেন। তাই দেখা যাচ্ছে, শিল্পপতি থেকে পীর, রাজনীতিবিদ থেকে আমলা সকলে টাকা কামানোর ধান্দায় লেগে আছে। টাকা কামাও, মাঠে বা মাঠের বাইরে রাজনীতি করো। এমপি হও। এরপর তোমাকে পাই কে! এমপি হলে নির্বাচনী এলাকার সব আপনার।

বালু মহল থেকে রঙ্গিন দুনিয়ার অন্দর মহল, হাট-বাজার-হাওড়-বাউড়-বিল-খাল, ফুটপাত থেকে রাজপথ, নদী থেকে সমুদ্র, টেন্ডার থেকে সরকারি সস্পত্তি, উড়ালপথ থেকে মহাকাশ সব আপনার আঙ্গুলের ইশারাই নাচবে। নিজের ও বউ-বাচ্চার নামে-বেনামে রাজধানী ঢাকাতে প্লট। সরকারি খরচে চিকিৎসা, বিদেশ ভ্রমণ, ভ্রমণ কর আর নাই কর সরকারি জাহাজ-গাড়ি-রেলগাড়ি-বিমানে সংরক্ষিত আসন। গণসংবর্ধনা থেকে নাগরিক সংবর্ধনা কী নেই! চাটুকারদের ট্রেডিশনাল পা ছুঁয়ে সালাম থেকে শুরু করে নিত্য নতুন পদ্ধতির সম্মান প্রদর্শন আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখবে। কবরস্থান কমিটি থেকে চাঁদ দেখা কমিটি সব জায়গায় নিজে অথবা নিজের চাটুকার সভাপতি। রাজহাঁস থেকে রাজভোগ খাওয়ার সব আয়োজনে আপনি মধ্যমনি। 

পুলিশ প্রহরায় উল্টো পথে উল্টো রথে চলাচলের অবাধ স্বাধীনতা। অন্ধকার জগত থেকে আলোকময় ভূবণে একই সাথে অবস্থানের সুযোগ। চারিদিকে চাটুকার, ভাই লোক হয়ে ওঠা! নির্বচনী মাঠে শিষ্যরা শ্লোগান দিবে-এমপি ভাই ছাড়া আর কোন ভাই নাই, ভাইয়ের কোন বিকল্প নাই। আপনি কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে গেলে কোমল মতি শিশুরা রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দাঁড়িয়ে থাকবে। বয়োবৃদ্ধ শিক্ষাগুরুটা পর্যন্ত আপনাকে স্যার স্যার বলে অস্থির হয়ে যাবে। 
পুলিশ-প্রশাসন সব যেন হুকুমের দাস। সবচেয়ে কার্যকর থানার ওসি আজ্ঞাবহ অনুগত অনুচর হিসেবে ছায়ার মতো লেগে থাকবে। যাকে তাকে যখন তখন ধমকান, কোন ব্যাপার না। আপনার ছেলেমেয়েরা প্রকাশ্যে রাজপথে পুলিশকে দু’টাকার চাকর বলে গালি দিতে পারবে, কিচ্ছু হবে না। রাস্তায় তাদের গাড়িকে পথ ছেড়ে দিতে দেরি হলে, রিক্সা চালককে প্রকাশ্যে দিবালোকে দিব্যি গুলি করে দিতে পারবে। আপনার ও আপনার সন্তানদের কাছে হরিণ শিকার আর মানুষ শিকারের মধ্যে পার্থক্য কী? এ নিয়ে কলমজীবীরা কলাম লিখবে। আপনার সন্তানরা ঘোষিত হবে ভবিষ্যতের অঘোষিত রাজপুত্র বা রাজকন্যা হিসেবে। হঠাৎ করে যদি মারা যান, আপনার স্ত্রী, সন্তান বা আপনার ভাই-বোন আপনার জায়গায় স্থলাভিসিক্ত হবেন। 

শুল্ক সুবিধা নিয়ে পাঁচ কোটি টাকার গাড়ি ৫০ লাখ টাকায় কিনে রাজপথ দাপিয়ে বেড়াতে পারবেন। নামমাত্র বাসা ভাড়ায় এমপি হোস্টেলে বা মন্ত্রীপাড়ায় থাকার সুখ। বেতন-ভাতা, ব্যাংক-বীমা, রেডিও-টিভি, বৈধ-অবৈধ ব্যবসা, বিলাসিতা কী নেই-এমপি জীবনে। মন্ত্রী বা অন্য উঁচু চেয়ার পেলেতো, পোয়া বার। কোনমতে, শুধু একবার হতে পারলেই হলো। ইহ জীবন ধন্য। আর জনগণ? পাঁচ বছর পর আবার দেখা হবে তার ভগ্ন কুঠরিতে। এরমধ্যে দেশে-বিদেশে আপনি বহু অট্টলিকার মালিক বনে যাবেন। লোকে বলে, এতো সুবিধা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইন্সুরেন্স কোম্পানি তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অফারেও দিতে পারবে না। জনগণের নির্দিষ্ট দিনে দেওয়া ভোট আপনাকে এমন অসীম সুবিধা আর অবারিত সুযোগের দূয়ার খুলে দিবে। 


রবিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৮

পিকনিক

পিকনিক! পিকনিক! মজার পিকনিক!
এই বলে বলে মেয়ে পটানো রোজিনের টেকনিক।
আমাদের বাসের সুপারভাইজার সাগর ভাই
বাসে উঠলে ভাড়া চায়।
সনু কই আমি কী ঘাস খাই
যা ভাগ তোর বেল নায়।
হাবিবের কাছে গেলে পারে
বলে সে লিজা সবকিছু জানে।
জানি না শুধু আমি
রীতা কেন এত হিট!
পিকনিক!পিকনিক...
আমাদের মনির ভাই
ছ্যাঁকা খাওয়াতে তার জুড়ী নাই
হ্যাটটিক করবে এবার সে
পিকনিকে গিয়ে!
প্রশান্ত অরন্যে হারাতে চায়
কিন্তু মেয়ে বল কোথায় পাই?
কামনার কামনায়
রুম্মানের মেয়েদের স্যান্ডেল বয়তে জীবন যায়।
ডিজুইসে কথা কয়ে
শাহীন মামার কান গেছে নষ্ট হয়ে।
বুবলী আছে সবচেয়ে সুখে
ইজ্ঞিনিয়ার আছে তার বুকে।
সাংবাদিক সাক্ষি রেখে
বিয়ে করে রীতা(হরিণাকুন্ড) গেছে ফেঁসে।
শিমু বসে ভাবে তাই
লুনার জন্য বর কোথায় পায়।
মামুন এগিয়ে এসে বলে
লিপি তোর কিছু লাগবে রে ?
ব্যাংগালুড়–তে প্রেমিকা রেখে
শুভ আছে সবচেয়ে দুঃখে।
নদীর বুকে বাঁধ দেওয়ার সুখে
আতা মামা কাজল দেয় চোখে।
নাসরিন বসে ভাবে তাই
রিপনের কাছে হাত দেখাতে বাঁধা নাই।
বিয়ে করার তরে সবুজ গেছে পাগলা হয়ে
মোবারকের দুঃখের সীমা নাই
সেলিম কেন ববিওয়াল খেতাব পাই।
জুন্নুন হাঁসে বসে বসে
ডাক্তার আছে তার সাথে
রোগ হলে চিন্তা নাই।
ফেরদৌস হাবেভাবে কবি
নাসির বোঝে তার সবি
চুপথাকা সাবরিনার হবি।
অণুরাধার কাছে একদফা এক দাবি
বইখাতা রেখে আমাদের দিকে একবার তাকাবি
পিকনিকে যাচ্ছি আমরা সবি।
আমি ভাবি বলবো না কাউকে কিছু
আলো নিয়েছে শাহীন ভাই এর পিছু।
শুভ্রাকে বলে মনিস
সেলিম ভাইকে আমার কথা একটু বলিস।
হালিম বলে রীণা
তোর মন খালি আছে কিনা?
কেঁদেকেটে কয় অনন্যা
দাদা মোরে টাইম দেয় না ।
সুমি ভেবে খুঁশি হয়
প্রেম বুঝি হয় হয়।
হঠাৎ আওয়াজ ওঠে বাসে
ইতি তুই কই রে !
গান না শুনে গলা গিয়েছে শুকায়ে।
হায় তুলতে তুলতে বলে সৃষ্টি
নিউমার্কেটে যাই শুধু দৃষ্টি
নিউমার্কেটের মতো জায়গা দুনিয়াতে নাই,
আর তাছাড়া ওর আজ গান গাওয়ার মুড নাই
সীতাকুন্ডে কী নিউমার্কেটের ফুসকা পাওয়া যায়?
মাঝপথে বাস হঠাৎ থামে
আতিক স্যার বলে, ছাত্ররা যাও সব নেমে
তোমরা হলে বটগাছ
সারো সব নিজ নিজ কাজ।
হুসনি আল্লাদের সুরে কয়
আম্মু আচারের নেশায় প্রাণ যায় যায়।
পিকনিক!পিকনিক!মজার পিকনিক!!!!
সীতাকুন্ডের ঝর্ণায় চল সবাই গা ভাসায়
পিকনিকে যাচ্ছি আমরা সবাই।

অবণীরা ভালো থেকো!!

অবণী বাড়ী আছো?

উচ্চতর ডিগ্রি নিতে বিদেশে অবস্থানরত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও মোস্ট ওয়ান্টেড ব্যাচেলার বন্ধুর ফেসবুক ওয়ালে পোস্টটি পড়ে আমার মনে একটা ঝড় বয়ে গেল । ও কী তাহলে দেশে ? কবে ফিরলো ও ? তা দেশেই যদি হবি , তাহলে শুধু অবণীদের খোঁজ কেন? আমরা কী দোষ করলাম !

আমার এক কবি বন্ধু আছে । ভালো কবিতা লেখে । হৈমবতী হলো ওর কবিতার নায়িকা। একদিন আমি তাকে হঠাৎ ফোন দিয়ে বললাম , বন্ধু আমাকে তোমার হৈমবতীকে ধার দিবা ? আমার আবদার শুনে সে বলল, কেনো তোমর কী কবি হবার ইচ্ছা হয়েছে? আমি বললাম , তুমি বুঝলে কী করে ? ঐ যে তুমি আমার হৈমবতীকে চাচ্ছো । কিন্তুু বন্ধু হৈমবতীকেতো আমি দিতে পারবো না । 

তাহলে তুমি কেমন কবি হলে ? কবিরা না অত্যন্ত উদার হয়। তাদের কাছে যে কেউ কিছু চাইলেই না তারা দিয়ে দেয় । কবিদের সম্পর্কে তোমার ধারনা মিথ্যে না , তবে তাই বলে তুমি আমার লেখার অনুপ্রেরণা  দিয়ে দিতে বলবা? আর তাছাড়া ও একটা কাল্পনিক চরিত্র মাত্র,বাস্তব না । তোমাকে কবিতা লেখা লাগবে না,তুমি যা পার তা লেখ । 

তা বেশ, তাহলে বিষয়টা দাঁড়ালো তোমার হৈমবতীকে আমাকে দিবা না । তা না দাও কিন্তুু একটা কথা বলে রাখি, আমি কিন্তুু তোমার হৈমবতীর প্রেমে পড়েগেছি।ওকে একদিন একটু ছুঁয়ে দেখার সুযোগ দিও।হাহাহাহা ... কবি বন্ধুর হাঁসি , তুমি যে কী বল এসব!

কবির সাথে কথা শেষ হতে না হতেই আর এক জন বাস্তব হৈমর কথা মনে পড়ে গেল। ওর নাম ছিল রোজলিন। আদোর করে ওকে আমরা রোজ ডাকতাম। আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর সাথে চুটিয়ে প্রেম করতো। আজ রোজ কী তোমার জন্য রোজ নিয়ে কলেজে এসেছিল? বলে-বলে খ্যাপাতাম আমাদের বন্ধুটিকে। ওর গল্প আর একদিন বলবো । আসলে ওর সাথে অনেক অলৌকিক বিষয় জড়িয়ে আছে তাই অলৌকিক নামে আর একটা লেখা লিখবো আর একদিন।

আসলে অবণী, হৈমবতী বা রোজ এরা আসলে কেউই মিথ্যে না আবার পুরোপুরি  বাস্তবও না কিংবা পরাবাস্তবও না। এরা সুখানুভূতি । ভালো থেকো অবণী । ভালো থেকো হৈমবতী, ভালো থেকো ।

টিভি

দুপুরের টিএসসি। আমি আর মালাশা মুখোমুখি বসে আছি। বলে রাখা ভালো, আমি মালাশার বিখ্যাত চোখের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছি।ওর চোখের মাঝখানে নিজেকে খুঁজছি?

আচ্ছা শোনো।

হুহ, বলো।

তুমি যদি আমার একটা চাওয়া পূরণ করতে পারো, তাহলে আমি তোমাকে বিয়ে করবো।

সত্যি! একটা চাওয়ার কথা বলছো কেন? আমিতো সারাজীবন তোমার চাওয়া পূরণ করার পন করেছি। জীবনে তোমার কোন চাওয়াই অপূর্ণ রাখবো না। বলো কী চাও।

তুমি পারবা না । 

টাকা থাকলে এদেশে বাঘের চোখও পাওয়া যায় । বল তুমি কি চাও ।

রাখ। তাও বলি। আমার একটা আসল বাঘ আর হরিণের কাঁটা মাথা চাই, মমিফিকেশন করা । বাঘের মাথাটা হবে ১০,০০০ বিসি সিনেমার বাঘটার মতো। মুখের সামনে বড়বড় দুটি দাঁতওয়ালা। আর হরিণের চোখদু’টি হবে স্বাভাবিক হরিণের মতো । মানে, মরার আগের যে অতঙ্ক আর ভয় চোখে প্রতিফলিত হয় তা হরিণটার চোখে থাকবে না । মায়াবি চোখ দুটি কাঁটা মাথায় জীবন্ত থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবে। স্বচ্ছ সুন্দর দুটি চোখ!

হরিণের চোখ কী তোমার চেখের চেয়েও সুন্দর হবে? তোমার চোখই তো পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর চোখ।    

ফাজলামি করছি না! সিরিয়াসলি বলছি।

ফাজলামি না সিরিয়াসলি জানতে চাচ্ছি।এগুলো দিয়ে কি করবা তুমি?

আমাদের বসার ঘরের দেয়ালে লাগিয়ে রাখব। যাতে সবসময় এদের দেখতে পাই। তুমি জানো, ঘুমানো ছাড়া মানুষ তার জীবনের বড় অংশ ড্রইং রুমে কাঁটায়। 

জানলাম কিন্তু বুঝলাম না । 

জানোতো, আমার সবচেয়ে পছন্দের কাজ হলো টিভি দেখা। কিন্তু ইদানিং আমি টিভি দেখতে পারছি না । টিভি খুললেই দেখি সারা দুনিয়াব্যাপি কিছু মানুষের মুখোশধারি বাঘ নিরিহ হরিণ শিকার করছে। আমি আাঁতকে উঠি। আমি এসব দেখতে পারি না । অনেক কষ্ট হয়। 

তুমি খবর না দেখে মুভি,বাংলা-হিন্দি সিরিয়াল দেখ। খবর না দেখলেইতো হয়। শুধুশুধু কষ্ট পাওয়ার দরকার কী।

সবসময় ফাজলামো করবা না , বুঝেছ। 

বুঝলাম । কিন্তু তোমার ড্রইং রুমে বাঘ আর হরিণের মাথা থাকলে কি হবে, তা বুঝলাম না ?

বড়লোকদের বাসার ড্রইং রুমে গেছো কখনও? ওদের ড্রইং রুমে হরিণের চামড়া বাঁধায় করে টাঙ্গানো থাকে। কেন জান? 

না।

এরা প্রকৃতির অপূর্ব সৃষ্টি  মায়াবী হরিণের মাংশ খায়। তার চামড়া ড্রইং রুমে টাঙ্গিয়ে রাখে নিদর্শন হিসেবে। আর তা প্রতিদিন দেখেদেখে  নিষ্টুর হওয়ার ট্রেনিং নেয়। ফলে কোন সুন্দরের হত্যাকান্ড এদের স্পর্শ করে না।

আমি মালাশার চোখ থেকে চোখ ফিরিয়ে নিলাম । জীবনে হয়তো ঐদিনই প্রথমবার আমি আমার মালাশাকে ভালোভাবে দেখেছিলাম। মনেমনে বলেছি, মনে এতো ব্যাথা পুশে রেখেছ কেন? মালাশা! মানুষের জন্য তোমার এতো মায়া কেন? এজন্যইতো তোমার চোখ এতো মায়াবি। চোখেই হয়তো মানুষের মন প্রতিফলিত হয়।তুমি দেবী, তুমি মানবী, তুমি রহস্যে ঘেরা উপত্যকা। আমি হয়তো কখনও তোমাকে পুরোপুরি বুঝবো না!    

মালাশা তুমি হয়তো জানো না, আমি আর টিভি দেখিনা। এখন টিভি খুললেই অসংখ্য মায়াবী চোখওয়ালা হরিণ আমার দিকে মায়ামায়া চোখকরে তাকিয়ে থাকে। দেখে মনে হয় দেবদূত। আর বাঘগুলো অট্টহেঁসে দাঁতবের করে তেড়ে আসে। তোমার মনের গভীরে জমানো ব্যাথার সাগর, আমার চোখে নোনা জল হয়ে ঝরে। কান্না আমার ভালো লাগেনা ।   
  




তাল তল্লাশি

ছোটবেলায় মায়ের বাঁধানো খাতায় গোটা অক্ষরে লেখা অথবা স্কুলে সুর করে আবৃত্তি করা কবিগুরুর কবিতা,‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে,সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মনে সাধ, কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়, একেবারে উড়ে যায়, কোথা পাবে পাখা সে...।’ আসলেই তাই হাতপাখা হওয়া যার নিয়তি উড়বার পাখা সে কোথায় পাবে । প্রচন্ড গরমে তালপাতার হাতপাখার বাতাস দেহ-মন শীতল করে। ‘তালের পাখা প্রাণের সখা, গরমকালে হয় যে দেখা’ কিংবা ‘তালের পাখার এমনই গুণ, বাতাস খেলে আসবে ঘুম’এমন অনেক ছড়া লোকমুখে প্রচলিত আছে আমাদের দেশে। এগুলো যে শুধু কথার কথা নয় তীব্র গরমে তা উপলব্ধি করা যায়। ইলেকট্রনিক্স চার্জার ফ্যানের এ যুগে ‘বাতাসটা কর;বাতাসটা করে যা।’-ওমনি চাকর প্রকান্ড এক তালপাতার হাতপাখা নেড়ে কর্তাবাবুর গায়েমাথায় বাতাস দিচ্ছে,নাটকের এমন অনবদ্য দৃশ্য আর দেখা যাবে না । তবে স্কুলের শিক্ষকের হাতের তালপাখা ও তার হাতলের পিটুনি খাওয়ার স্মৃতি কেউ কেউ মনে করতে পারবে হয়তো । আসলে আমাদের জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে তাল গাছ ।

তাল গাছ, যার বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer,৩০-৪০ ফুট লম্বা হয় সাধারণত। শতবর্ষী এই গাছের পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাতির মধ্যে শুধু স্ত্রী প্রজাতিই ফল দেয় এবং ফলের বেশিরভাগ অংশ জলীয়। এর শাঁস শরীরের কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ করে, এমনকি ক্ষয় হয়ে গেলে তাও পূরণ করে। তাল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণসমৃদ্ধ হওয়ায় ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। পরম পরোপকারী এই বৃক্ষ জন্মের বছর পার না করতেই নিজেকে মানবসেবায় নিবেদিত করে।

তাল গাছের প্রতিটি অঙ্গ থেকেই কিছু না কিছু প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি হয়। এর পাতা থেকে তৈরি হয় হাতপাখা। আবার ঘর ছাওয়া, চাটাই, মাদুর, আঁকবার পট, লেখার পুঁথি কিংবা পুতুল তৈরিতেও ব্যবহার হয় তালপাতা। তাল গাছের কা- থেকে রস সংগ্রহ করা হয় এবং তা থেকে গুড়, পাটালি, মিছরি, তাড়ি (একপ্রকার চোলাই মদ) ইত্যাদি বানানো হয়। তালগাছ দিয়ে বাড়ি কিংবা নৌকা বানায় বিশ্বের বহু উপজাতি। আমাদের দেশে তালের গাছ দিয়ে তৈরি নৌকাকে বলা হয় ডোঙ্গা। দু-তিনজনের পারাপার, মাছ ধরা, ধান কাটা, শাপলা তোলা, শামুক সংগ্রহ, হাওর, বিল, বাঁওড়, পুকুর ও মাছের ঘেরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ডোঙ্গা। এছাড়া নতুন রাস্তার ল্যান্ডস্কেপ, বাঁধ ও নদীর ভাঙন ঠেকাতে জিও টেক্সটাইল হিসেবে তালের ছোবরা থেকে তৈরি নেট/জালের সফল প্রয়োগ বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি করেছে নতুন সম্ভাবনা। এটা মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে রোধ করে পরিবেশ বিপর্যয়। উঁচু গাছ হওয়ায় তাল গাছের পাতায় শিল্পের গাঁথুনিতে নান্দনিকতার বুননে নকশিজালের নীড় তৈরি করে নিরাপদ আশ্রয় বানায় বাবুই পাখি। শক্ত বুননের এ কুঁড়েঘর শিল্পের বড়াই করার মতো অপরূপ ঐশ্বর্য, যা প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও ঝুলতে থাকে তালপাতার সঙ্গে। বাবুই ছাড়াও আরও অসংখ্য পাখির নিরপদ আশ্রয় তাল গাছ।

আমাদের দেশে কবিতা, গানে, কথায়, উপমায়, প্রবাদবাক্য, ছড়াসহ সাহিত্যের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তাল গাছের ব্যবহার নেই । তালপাতার সেপাই, তাল বেতাল, তিলকে তাল করা, পিঠে তাল পড়া এমন অনেক উপমা রয়েছে বাংলা সাহিত্যে। কবি তার গ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন ‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ...’। গ্রামের মেঠো পথের ধারে কিংবা গ্রামের দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা মাঠে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছের সৌন্দর্য সবাইকে বিমোহিত করে। যদি কখনো চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায় ডিসি ইকো পার্কে যাওয়ার সুযোগ হয় তাহলে এর প্রবেশ পথে দেখবেন একটি সড়ক, যার নাম ‘তালসারি’। এই সড়কের দু’পাশজুড়ে রয়েছে সারিবদ্ধ তাল গাছ। তাল গাছের দ্বারা শোভিত এমন সুন্দর সড়ক দেশের আর কোথাও আছে কি-না আমার জানা নেই। অবশ্য সুদৃশ্য এ সড়কটি তৈরির গল্পটিও বেশ চমৎকার অবিভক্ত বাংলার জমিদারি শাসনামলে ওই এলাকার প্রতাপশালী জমিদার নফর পাল চৌধুরীর স্ত্রী রাধারানী ইচ্ছা পোষণ করেন ছায়াঘেরা পথে কৃষ্ণনগর (পশ্চিম বাংলার একটি জেলা শহর) যাওয়ার। রাধারানীর ইচ্ছা পূরণ করতে নাটুদাহ থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত সড়ক ছায়া সুনিবিড় করার উদ্যোগ নেন জমিদার। তাঁর পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলেও প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কের সঙ্গে এক কিলোমিটার পরপর ফলবাগান গড়ে তোলা হয়। এছাড়া সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন জাতের গাছের চারা রোপণ করা হয়। তবে কালের পরিক্রমায় বিলীন হয়ে গেছে জাম, কুল, কাঁঠাল, লিচুসহ অনেক গাছের চিহ্ন। তবে রাধারানীর ইচ্ছা আর জমিদারের উদ্যোগকে স্মরণ করিয়ে দিতে পথের দু’ধারে কালের সাক্ষী হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাল গাছগুলো। এই পাখি ডাকা, ছায়াঘেরা পথ যে কাউকেই মুগ্ধ করবেই। এতো গেল প্রেয়সীর ইচ্ছা পূরণের রোমান্টিক গল্প। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি, বাঁশি কই আগের মতো বাজে না, মন আমার তেমন কেনো সাজে না...’ গানটি গায়নি এমন বাঙালি যুবক বিরল।

বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাল গাছ। কিন্তু সমস্যাটা বাঁধে যখন এর মালিকানার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কবিতার পরের লাইন যেহেতু ‘ওই খানেতে বাস করে কানা বোগির ছা..’। সে দীর্ঘদিন ধরে তালগাছে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে, সেহেতু তালগাছের প্রকৃত মালিক হওয়ার কথা ছিল উল্লেখিত কানা বোগির বংশধরদের। কিন্তু তাল গাছের মালিক হওয়ার মূল লড়াইটা হয় মানুষের মধ্যে। বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এর মালিকানা দাবি করে। আর যারা দাবি উপস্থাপন করে, তারা অঙ্গীকার করে যে তারা বিচার মানে। বিচার মানলেও তাল গাছের মালিক অন্য কেউ হয়ে যাবে, এটা তারা মানতে পারে না। আমাদের দেশের বাস্তবতায় ‘সব মানি কিন্তু তাল গাছটা আমার’ এই প্রবাদটি শুনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই তাল গাছ নিয়ে ঠেলাঠেলির ফলে আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোট জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো ঐকমতে পৌঁছাতে পারে না। এমনকি জাতিসংঘ, ইইউ, দাতা সংস্থাসহ বিদেশি বন্ধুরাও তাল গাছের প্রকৃত মালিক কে তা ঠিক করে দিতে পারছে না। শোনা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে তাল গাছটা কার হবে এ বিষয়ে সালিশ বসবে ইউরোপের কোন একটি দেশে। এরই প্রস্তুতি স্বরূপ মাঝে মাঝে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মুখ থেকে তাদের অবস্থান ও নতুন নতুন ফর্মুলা, ভিশন, নির্বাচনকালীন সরকার আরও কত কী গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা জানতে পারি। কিন্তু বাস্তবতার ভাঁড়ে ভবানী, এ দেশে অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বচন বাস্তবে অন্তঃসারশূন্য লোকগাঁথাই মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত।

সে যাই হোক, রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির ময়দান থেকে তাল গাছের সাম্প্রতিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো, বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমানোর জন্য দেশব্যাপী ১০ লাখ তাল গাছের চারা রোপণ করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। গতবছর সংবাদমাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয় ছিল দেশে বজ্রপাতে চার দিনে ৮২ জনের মৃত্যুর ঘটনা । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে মার্চ থেকে মে এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জে। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে নাসার বিজ্ঞানী স্টিভ গডম্যান নেতৃত্বে¡ একদল গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে ভীতিকর এই তথ্য। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে ২০১৪ সালে ৯১৮টি, ২০১৫ সালে ১ হাজার ২১৮টি এবং ২০১৬ সালে দেড় হাজারেরও বেশি বজ্রপাত আঘাত হেনেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে দেশে বজ্রপাতে ১ হাজার ১৫২ জন মারা গেছে। তবে বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের হিসেবে এই সংখ্যা ১ হাজার ৫৮৯ জন। এর মধ্যে গত বছর মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ, ২১৭ জন। অর্থাৎ বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার হচ্ছে, জমিতে কর্মরত দরিদ্র কৃষক। এদেশে আর সব ক্ষেত্রে যা হয় এ ক্ষেত্রেও সেই একই ফর্মুলা, মৃত ব্যক্তির পরিবার পাবে নগদ ২০ হাজার টাকা আর আহত ব্যক্তি পাবেন ৫-১০ হাজার টাকা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা আমাদের দেশের বেশিরভাগ হাসপাতালে নেই। অথচ গতবছর সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। চলতি বছরেও এদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে গেছে, মে পর্যন্ত মারা গেছে ৬২ জন(মে ১৯,২০১৭, দৈনিক প্রথম আলো)। বছরের বাকি সময়ে মৃত্যুর মিছিলে আর কত জন যোগ হবে তা সময়ই বলে দেবে।

মৃত্যুর এই মিছিল ঠেকাতে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতার আলোকে বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে তাল গাছ রোপনের এমন সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয়ের মতে, বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকানোর জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর স্থানীয় প্রযুক্তি। আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা হলো, আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনো বড় গাছের ওপর পড়ত। যেহেতু বজ্রপাত এক ধরনের বিদ্যুৎ রশ্মি তাই গাছ হয়ে তা মাটিতে চলে যেত। এতে মানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের প্রায় সর্বত্রই তালগাছসহ বড় বড় গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এখন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরলেও তালগাছসহ বড় আকারের কোনো গাছ দেখা যায় না।

অনেকের ভ্রান্ত ধারনা, তাল গাছ লাগানো অশুভ। দেরিতে ফল দেয় এ কারণে অনেকেই এটি রোপণ করেন না। তবে অবাক করা বিষয় হলো বেশির ভাগ মানুষ মধ্য কিংবা শেষ বয়সে এসে তালগাছ লাগাতে পছন্দ করেন। কেননা, তত দিনে সে বুঝে যায় ইহ লীলা সাঙ্গ হবে আর এই দুনিয়ার কিছুই সে সঙ্গে নিয় যাবে না। তাই দেরি না করে আসুন সকলে অন্তত একটি করে তাল গাছ লাগাই। আজকে লাগানো গাছটিই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃদ্ধি পাওয়া কালবৈশাখী, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়,বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় মাথা উঁচু করে বুক পেতে দেবে মানুষ আর বসতভিটা রক্ষায়। নিজের মাথায় প্রকৃতির বজ্রবানের আঘাত গ্রহণ করে এরা আমাদের অনাগত প্রজন্মের জীবন রক্ষা করবে। তাই দেশজুড়ে যত বেশি তাল গাছ বাংলার আকাশে উঁকি দেবে তত বেশি কমবে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় : “মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ”

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন নিয়ে আমার কিছু বলার নেই । এতটুকুই শুধু বলবো,মহান জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সরকারি চাকরিতে কোটা বিলোপের ঘোষনা দিয়েছিলেন , সেই আনন্দে ছাত্রলীগ আনন্দমিছিল করেছিল ! কেবিনেট সচিবকে প্রধান করে একটা কোটা সংস্কার কমিটি করা হয়েছে।এসব করে সরকার কোটা সংস্কারের দাবির যৌক্তিকতা স্বীকার করে নিয়েছে   প্রকারন্তরে  । এখন তারা কেন যারা কোট সংস্কার চায় তাদের হাতুড়ি পেটা ও মন্ডুপাত করছে, তা আমার বোধগোম্য নয়।   

দেশে ছাত্রসমাজের মধ্যে চলমান অস্থিরতা ও  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নেয় কিছু সিদ্ধান্ত এই মহান বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন সাবেক ছাত্র হিসেবে আমাকে একই সাথে চিন্তিত ও সংঙ্কিত করে তুলেছে। আমার সত্যিই ভাবতে অবাক লাগে ১৯৪৭ সাল পরবর্তী যে বিশ্ববিদ্যালয় পুরো বাংলাদেশকে তার বুকে ধারন করে ৫২’র ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর নেতৃত্বে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত নানা আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম দিয়েছে এবং স্বাধীনতা পরবর্তীতে সকল স্বৈরাচার অপশক্তিকে হাটিয়েছে সেই পূণ্যভূমি এই সময় এসে ছাত্রদের আন্দোলন সংগ্রামকে ভয় পাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সবার ঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ঠ্যই হলো এ বিশ্ববিদ্যালয় সবার জন্য উন্মুক্ত। এই বিদ্যাপিঠের ছাত্র,শিক্ষক,কর্মকর্তা,কর্মচারী ছাড়াও যেকেউ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনভাবে বিচরণ করতে পারে। তাছাড়া নানা পথ ও মত কে এর সম্মান জানানোর ক্ষমতা ও তা লালন করা মত অনন্য বৈশিষ্ঠ্য এই বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আলাদা করেছে। এমন কী যদি তা প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় নিষিদ্ধও হয়। উদাহরণস্বরূপ, সমকামীতার কথায় ধরা যাক । আমাদের সময় আমাদের হলে আমাদের ইয়ারের একটা সমকামী কাপল ছিল । আমারা তাদেরকে হল ছাড়া করেনি । আমরা অন্য সবার মতো তাদের সাথেও পাশাপাশি বসে চা খেয়েছি , ডাইনিং এ পাশাপাশি বসে ভাত খেয়েছি।এই অন্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করার শিক্ষা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ আমাকে আমাদের শিকিয়েছে অন্য কেউ নয় বা অন্য কিছু নয়। দেশের সকল শ্রেণীপোশার মানুষের বিচরণে সবসময় মুখরিত থাকে এই বিদ্যাপিঠ । এমন কী কিছু নেশাগ্রস্থ মানুষকেও এই বিশ্ববিদ্যালয় তার মমতায়পূর্ণ বুকে ঠাঁই দিয়েছে। এতো স্বাধীন ও নিরাপদ বোধ করে আপনি বাংলাদেশের আর কোথাও নেশা করতে পারবেন না ।এ কথা আমি হলপ করে বলতে পারি। এই ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসের ছেলে মেয়েরা যেমন হাতে হাত রেখে চলাফেরা করতে পারে তেমনি পুরান ঢাকা থেকে আসা অনেক ঝাকঝিক পোশাক পরা তরুণীটিও তার প্রিয় মানুষটির সাথে হাতে হাত রেখে স্বাধীনচিত্তে মনের আনন্দে ঘুরাফেরা করতে পারে। যেটা বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় বিরল। প্রকৃতপক্ষে সমঅধিকারের একটি মায়বী বটগাছ পোতা আছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে।সেটা প্রতিনিয়ত সমঅধিকার নামক অক্সিজেন ছাড়ে এই বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে। তাইতো পাকিস্থান থেকে আজকের বাংলাদেশ সবসময় এই ক্যাম্পাস থেকে সমঅধিকারের দাবি ধ্বনিত হয়।  

জাতীয় তীর্থস্থান এই বিদ্যাপিঠঃ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, এটা বাংলাদেশ তথা বাঙ্গালীর স্বাধীনতা রক্ষার সর্বোচ্চ রক্ষাকবচ থেকে শুরু করে এ দেশের কোটি মানুষের দাবি,আশা- আকাঙ্খা, উৎসব,সুখানুভূতি প্রকাশের সর্বোচ্চ তীর্থস্থান ।  সকল গণদাবি আদায়ের লীলাভূমি এই বিশ্ববিদ্যালয়। এখন পর্যন্ত যে কেউ বা যে কোন শ্রেণীপেশার মানুষ তাদের দাবি আদায়ের জন্য ধরনা দিতে আসে এখানেই।  বাংলাদেশে কোন বিষয়ই জাতীয় বিষয়ে পরিণত হয় না যতক্ষন পর্যন্ত না সেখানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্প্রিক্ত হয়। পহেলা বৈশাখে পালিত মঙ্গল শোভাযাত্রার কথাই বলা যাক, যশোরে প্রথম শুরু হওয়া মঙ্গল শোভাযাত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন থেকে পালিত হওয়া শুরু করেছে তখন থেকেই তা বাঙ্গালীর জাতীয় উৎসবে পরিণত হয়েছে। 

এই বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের হৃদয়ঃ

বাংলাদেশের প্রয়োজনে,আনন্দ-বেদনায় সবার আগে সাড়া দেয় এই বিদ্যাপিঠ। আর্তমানবতার সেবাই  রক্তদানে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা অনন্য নজির স্থাপন করেছে এবং রক্তদানকে একটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ দিয়েছে। দেশে যখনই কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দেয়ে সবার আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাই ছুটে যায়। আবার বাংলাদেশ যখন ক্রিকেট খেলায় জেতে তখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসহ সবাই এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছুটে আসে অনন্দ প্রকাশ করতে আর যারা আসতে পারে না তারা অন্তত টিভির পর্দায় একবার হলেও চোখ রাখে টিএসসি এলাকায় কী হচ্ছে তা দেখার জন্য । এখন প্রশ্ন হলো, এখন যদি এমন জাতীয় আনন্দের উপলক্ষ্য আসে তবে বাংলাদেশের পতাকা হাতে মোটরবাইক চালিয়ে কিংবা পায়ে হেঁটে আসা, বাংলাদেশের আনন্দ বুকে ধারন করা যুবকটি প্রক্টরের অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ঢুকার জন্য ?  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন সংগ্রাম ও বহিরাগতঃ

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হলে বহিরাগতরা হলো অবধারিত অনুষঙ্গ। এ বিষয়ে যাদের কোন প্রকার সন্দেহ আছে তরা একবার মহান ভাষা আন্দোলনের শহীদদে সম্পর্কে বিস্তারিত জানার চেষ্টা করবেন,তাহলে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবে । তাঁদের কজন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর কজন বহিরাগত? শুধু ৫২’ র ভাষা আন্দেলন নয় এর পরবর্তী যতগুলো আন্দোলন হয়েছে এবং সর্বশেষ এক এগারর মইন উদ্দীন-ফকরুদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে বহিরাগতরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের পাশাপাশি ছিল, ইতিহাস তার সাক্ষি। মইন উদ্দীন-ফকরুদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে আমি সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছি । স্যার এ এফ রাহমান ছাত্র হিসেবে নীলক্ষেত পয়েন্টে এখন যেখানে “মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ” আমরা আন্দোলন করেছি। আমরা দেখেছি আমাদের সাথে যখন বহিরাগতরা যুক্ত হলো তখন পুলিশের সাথে চলমান সংঘর্ষ ভাওলেন্ট রূপ ধারণ করল। পুলিশের সাজোয়া যানে পেট্রোলবোমা আমাদের হলের কেউ মারেনি । এর কিভাবে আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছিল এ ব্যাপারে আমার মতো হলের সাধারণ ছাত্ররা কেউ কিছু বলতে পারবে না । হলের তৎকালীন ছাত্রনেতারা বলতে পারবে হয়তো । 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গেট :“মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ”ঃ

ভাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়টা কোন দিকে ? বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে স্যার এ এফ রাহমান হলে থাকার সুবাদে এই হলের সামনে দাঁড়িয়ে প্রশ্নটির মুখোমুখি হয়েছি অসংখ্যবার। আমাদের সময় তখন নীলক্ষেতের দিকে গেট নির্মিত হয়নি । জীবনে প্রথমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে আমার মনেও এই একই প্রশ্ন জেগেছিল। প্রায় দেখা যেত প্রশ্নকারী মহসীন হলসহ কোন না কোন হলে তার আত্মীয় বা এলাকার কোন ছাত্রর সাথে দেখা করতে এসেছে। 

আমরা যখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তী হয় তখন স্যারেরা প্রায় একটা কথা বলতেন,  প্রিয় ছাত্ররা তোমরা যে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হবার গৌরভ অর্জন করেছ তার নির্দিষ্ট কোন গেট নেয়। তার মানে এখানে যে কেউ যে কোন স্থান দিয়ে প্রবেশ করে জ্ঞান অর্জন করতে পারে । আমরাও ছাত্র জীবনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালযের গেট না থাকা নিয়ে গর্ব করতাম । ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে নিয়ে চলমান চক্রান্তের অংশ হিসেবে স্যার এ এফ রাহমান হলের পূর্ব পার্শ্বে নীলক্ষেতের দিকে গেট তৈরী করা হয়েছে। এই গেটের আবার কেতাবী নাম “মুক্তি ও গণতন্ত্র তোরণ” । তবে এখানে বলে রাখি , পৃথিবীর সমস্ত ক্ষমতাবান কর্তাব্যক্তিরা যা বলেন ও করেন,মিন করেন তার উল্টোটা । 

যেমন,এই গেটের কথায় ধরা যাক স্যার এ এফ রাহমান হলের সাবেক ছাত্র হিসেবে এবং এক-এগারর মইন উদ্দীন-ফকরুদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পরি এই পয়েন্টটা  কতটা গুরুত্বপূর্ণ । আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি , ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঢোকার আর বাকী যে ৭টি পথ আছে সেগুলোতেও অতিতাড়াতাড়ি গেট নির্মিত হবে । আমার বিশ্বাস চলমান মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সাথে সাথেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে গেট ও প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলার কাজটি সম্পন্ন করা হবে । এবং বাকী সাতটি গেটের ও এরকম কেতাবী নাম হবে। এবং এসব গেটের নাম রাখার জন্য অনলাইনে প্রতিযোগিতারও আযোজন হতে পারে।  বিশেষ করে শাহবাগ মোড়ে যে গেট নির্মিত হবে তার নামকরণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি আন্দোলনও হতে পারে। এবং এসবই করা হবে বাংলাদেশের মুক্তি ও গণতন্ত্রকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে। যেটার ঈঙ্গিত প্রথম গেটের নামকরনের মধ্যে দেওয়া হয়েছে। 

এরপর এই বিশ্ববিদ্যালয়ে যখনই কোন আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হবে তখন এসব কেতাবী নামধারী গেটগুলোয়  তালা মেরে সামনে সাজোয় গাড়ী, জলকামান রেখে সহজে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন সংগ্রামকে  নিয়ন্ত্রন করা যাবে। নিয়ন্ত্রিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হবে নিয়ন্ত্রিত বাংলাদেশের সংক্ষিপ্ত রূপ। ইতমধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্দানকে প্রাচীর দিয়ে ঘিরে ফেলে অর্ধেক কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে চলমান ষড়যন্ত্রঃ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীর বইগুলো ছাত্ররা যাতে পড়তে না পারে সে জন্য অনেক আগেই তালাবদ্ধ করে ফেলা হয়েছে । এখন চলছে বাকী কাজটুকু । চলমান ষড়যন্ত্রের দুটা দিক আছে-

প্রথমতঃ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে পরিকল্পিতভাবে সাধারণ জনমনে এক ধরনের ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরী করা। 

এর অংশ হিসেবে ক্যাম্পাসে এখন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়ে একসাথে বসে থাকলে কিংবা এক রিক্সাই চলাফেরা করলে হামলার শিকার হচ্ছে। ক্যাম্পাসে সাবেক ছাত্র,শিক্ষক থেকে শুরু করে কেউই আক্রান্ত হতে বাদ যাচ্ছে না । এই সব করা হচ্ছে যাতে অন্যরা এমনিতেই ভয় পায়। টিএসটি ও সোহরাওয়র্দী উদ্দান কেন্দ্রীক যে আড্ড তার পরিসর দিনদিন ছোট করে আনা হচ্ছে।এবছর পহেলা বৈশাখে প্রাণের  ক্যাম্পাসে গিয়ে বৃষ্টির মুখে পড়ে টিএসসিতে আশ্রয় নিতে গিয়ে দেখি সেখানে তালা মারা! তারপর দেখি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে চারিদিকে গেট তৈরীর হিড়িক পড়েছে । বৃষ্টির মধ্যে বাচ্চা নিয়ে শেষ পর্যন্ত আমার হল স্যার এ এফ রাহমান হলে গিয়ে আশ্রয় নিয় । বৃষ্টির মধ্যে হাঁটতে হাঁটতে হলের যাওয়ার পথে আমরা বারবার একে অপরের মুখের দিকে চাওয়া চাওয়ি করেছি । এটা কী আমাদের ক্যাম্পাস ? বৃষ্টির মধ্যে মানুষকে আশ্রয় দিতে পারে না ? 

দ্বিতীয়তঃ এই বিশ্ববিদ্যালয় কে এদেশের রাজনীতিবীদদের থেকে বিশেষ করে মূলধারার রাজনীতিবিদদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা। যাতে পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতায় এসে দীর্ঘদিন ক্ষমতার মসনদে থাকা যায়।

এর লক্ষ্যণ দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে। আমার সঙ্কার জায়গা ঠিক এখানে । ছাত্র থাকাকালীন এক এগারর মইন উদ্দীন-ফকরুদ্দীন সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সময় দেখেছি বর্তমান উপ-উপচার্য আমার প্রিয় শিক্ষক ড.মোহাম্মদ সামাদ(কবি সামাদ স্যার),তিনি কত শক্ত হাতে সরকারের নানা গোয়েন্দা সংস্থাকে সামলেছেন। স্যার আমাদের ক্লাসে মাঝে মাঝে বিশেষ একটা গোয়েন্দা সংস্থার কর্তাব্যক্তিদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে করা প্রশ্ন সম্পর্কে বলতেন, গাধারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে এই সামান্য জ্ঞানটুকু রাখেনা । আমরা শুনে মজা পেতাম । তবে এখন বুঝছি, তারা ঐ সময় সঠিক জ্ঞানটুকুই নিয়ে গেছে। আর সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য স্যারদের দিয়েই তারা তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন করাচ্ছে। বর্তমান রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেভাবে ছাত্রদের বর্তমান ও ভবিষ্যত রুজি নিয়ে তুচ্ছতাচ্ছিল ও অবজ্ঞা করছে তাতে তারা যে তরুন প্রজন্ম বিশেষ করে সাধারণ ছাত্রসমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের সুযোগ সুবিধা বাড়িয়ে সরকার এমনিই দেশের সব শ্রেণীপেশার মানুষের বিরাগভাজন হয়ে বসে আছে। পরশ্রীকাতরতা যে বাঙ্গালীর বড় মূদ্রাদোষ তা এই সরকারের মনে হয় মনে নেই। ভুলোমনের কারনে  দেশে যে একধরনের অস্থিরতা কাজ করছে তা সরকার খেয়াল করছে না । আর এই সুযোগে,“মাইনাস টু”- একটা মূলদ না অমূলদ সংখ্যা ? এই অংক করতে যারা একদিন ব্যর্থ হয়েছিল তারা  অংক সাবজেক্টটাই জাদুঘর পাঠাবার ব্যবস্থা করছে সংগোপনে। বাংলাদেশে যেভাবে পাকিস্থানি মডেলে “আর্মি অর্থনীতি” কে বাড়তে দেওয়া হয়েছে এবং স্বৈরাচার তাড়ানোর ভ্যানগার্ড ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে পরিকল্পিতভাবে তাদের দ্বারাই বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হচ্ছে ও এই বিশ্ববিদ্যালয়কে গেট ও প্রচীর দিয়ে যেভাবে ঘিরে ফেলা হচ্ছে,তাতে আমার ধারণা বাংলাদেশ মিশরীয় পরিণতির দিকে এগুচ্ছে দিন দিন । তবে হাতে এখনও সময় আছে কিন্তু তা বেশী না। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কখনও ঘুমায় না ঃ

একটা জনিসের চরিত্র বদলে যওয়া নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কসকো সাবানের পরিণতি নিয়ে একটা স্টেটাস বেশ ঘুরাফেরা করে ভিন্ন ভিন্ন জনের ওয়ালে । “কসকো এক সময়ের বিউটি সোপ এখন টয়লেট সোপ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।” এখানে বলে রাখি যারা ভাবছেন চারিদিকে দেয়াল আর বড়বড় গেট নির্মান করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চরিত্র বদলে ফেলা যাবে, তারা দিবা স্বপ্ন দেখছেন । তারা বোধ হয় জানেন না,ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হলো দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয় সেটা রাতদিন ২৪ ঘন্টা জেগে থাকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শুধু একটা বিশ্ববিদ্যালয় নয়,এটা একটা একটুকরো আকাঙ্খিত বাংলাদেশ। সারা বাংলাদেশকে বুকে ধারণ করে এই বিশ্ববিদ্যালয় কখনও ঘুমায় না । 
         

মাইনাস ওয়ান আর প্লাস ওয়ান= জিরো না প্লাস ওয়ান আর প্লাস ওয়ান= টু ?

একাদশ জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। সাংবিধানিক বধ্যবাধকতার কথা বিবেচনায় নিলে, ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে অবশ্যই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর নির্বাচনের অনন্ত ৯০ দিন আগে তফসিল ঘোষণার নিয়ম। তাই আসছে অক্টোবর মাস জটিল সব সমীকরণ নিয়ে হাজির হতে যাচ্ছে। ৩০ অক্টোবরের পর থেকেই নির্বাচনের কাউন্টডাউন শুরু হবে। বর্তমান অবস্থার কোন নাটকীয় পরিবর্তন না হলে নির্বাচনকালীন সরকার শপথ নিবে অক্টোবর মাসে। এখন প্রশ্ন হলো আসছে অক্টোবরে আমরা আলোর পথে যাত্রা করবো না অন্ধকারে নিমজ্জিত হব। দু’টার যেকোন একটার সম্ভাবণা কিন্তু আছে।

এ দেশের যে কাউকে জিজ্ঞাসা করেন দেশের রাজনীতির হালচাল কী? সে আপনাকে ঘন্টার পর ঘন্টা বিচার বিশ্লেষণ করে শোনাতে পারবে। তবে তাকে জিজ্ঞাসা করেন, আসন্ন নির্বাচন কিভাবে হবে? সবদল কী অংশগ্রহণ করবে তাতে? সব নাগরিক কী নির্বাচনে ভোট দিতে পারবে এবার? এর কোন সদুত্তর সে দিতে পারবে না। এটা গ্রামের দিনমজুর থেকে শহরের বুদ্ধিজীবী কেউই বলতে পারছে না, এখনও। আসন্ন সংসদ নির্বাচন নিয়ে কী হতে চলেছে। সবার উত্তর মোটামুটি একই ধরণের, দেখা যাক কী হয়। বর্তমান এই পরিস্থিতিই দেশের রাজনীতিতে ব্লাকহোলের জন্ম দিয়েছে। সিনিয়র সাংবাদিক সোহরাব হাসান সম্প্রতি তার একটি লেখায় জাতির কাছে প্রশ্ন রেখেছেন, নির্বাচন হবে, গণতন্ত্র বাঁচবে তো?

রাজনীতির মাঠে আর যে প্রশ্নটা বারবার আলোচিত হচ্ছে, বিএনপি এবারও নির্বাচনে না এলে কী হবে? তা হয়তো ভবিষ্যত বলবে। অবশ্য নির্বাচনে আসা ছাড়া তাদের সামনে কোন বিকল্পও নেই। এবার নির্বাচনে না এলে দল হিসেবে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। ফলে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় থাকতে তারা আবার নিবন্ধন ফিরে পাবে, এ কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না। নিবন্ধন ফিরে পেলেও বিএনপি থেকে জিয়া পরিবার যে বিলুপ্ত হয়ে যাবে, একথা বলার জন্য বিষেশজ্ঞ হতে হয় না। সরকার অবশ্য তার সর্বশক্তি ও বিএনপির একটা অংশকে কাজে লাগিয়ে চাইবে খালেদা জিয়কে ছাড়া বিএনপি যাতে নির্বাচনে না আসে। তবে অবস্থা দৃষ্টিতে যা মনে হচ্ছে দলটি যেকোন পরিস্থিতিতে নির্বাচনে আসবে। একথা বুঝতে পেরে সরকার সারা দেশে বিএনপির নেতাকর্মীদের ধরপাকড় ও তাদের বিরুদ্ধে মামলা দেওয়া শুরু করেছে।   

অপর দিকে, যেখানে মামলা ও ভয়ে বিরোধী দল পালাবার পথ পাচ্ছে না ঠিক সেসময় ক্ষমতাসীন দলের বর্তমান সাংসদগণ ও নতুন মনোনয়ন প্রত্যাশীগণ রাজনীতির মাঠ গরম করে রেখেছেন। এককথায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি হলো, আওয়ামী লীগ ভোটে আর বিরোধীরা কোর্টে। এমন পরিস্থিতিতে রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি, জাতীয় ঐক্য বা যুক্তফ্রন্ট নিয়ে অনেক কথা হচ্ছে। রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি যে রাজনীতি বোঝে ও করতে জানে তার পরিচয় দিচ্ছে জাতীয় ঐক্য নিয়ে। প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভে ড. ও ডা. রা এই বৃদ্ধ বয়সে ছুটে বেড়াচ্ছেন! দেশের গণতন্ত্র ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কথা বলছেন, সরকারের সমালোচনা করছেন। যা বিএনপিকে রাজনীতির মাঠে সরব হবার সুযোগ করে দিয়েছে। ঐক্য ঐক্য খেলাকে বিএনপি পুরোপুরি কাজে লাগাতে ব্যস্ত।  

তবে পর্দার আড়ালে আর যে বিষয়টি চলছে তাহলো, দেনদরবার ও দৌড়ঝাপ। একদফা ভারতে দৌড়ঝাপ শেষ করে আমাদের রাজনীতিবিদগণ জাতিসংঘ দৌড়ঝাপও সেরে ফেলেছেন। আরেকদফা হয়তো ভারতমুখী দেখা যাবে সবাইকে। আমাদের দেশে দুটো উত্তরপাড়া আছে। একটা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে আর একটা রাজধানী ঢাকায়। রাবির উত্তরপাড়া প্রেম ও ভালোবাসার সুবাতাস ছড়ায় আর ঢাকার উত্তরপাড়া দেশের  রাজনীতিতে উত্তাপ ছড়ায়। ঢাকার উত্তরপাড়ার এখন সুসময়। আমাদের রাজনীতিতে তারা গুরুত্ব পাচ্ছে। নিয়মিত গোপন বৈঠক হচ্ছে ওপাড়ায়- এমন ধারণা অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকের।

রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে নারীর ক্ষমতায়নের চুড়ান্ত উদাহরণ হলেন, আমাদের প্রধান দুই নেত্রী। একজন বর্তমান ও আর একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী। আমাদের যত অর্জন তাদের হাত ধরেই। নারী নেতৃত্বকে সম্মানের সাথে দেখতে তাঁরা আমাদের শিখিয়েছেন ও অভ্যস্ত করেছেন। তবে তাদের উপর হামলা-মামলা ও রাজনীতি থেকে তাদের সরিয়ে দেওয়ার চক্রান্ত কম হয়নি। ওয়ান ইলিভেনের সময় মাইনাস টু ফরমূলা বাস্তবায়ন করার খুব চেষ্টা করা হয়েছিল। এদেশের রাজনীতি পাগল জনগণ তা বাস্তবায়ন করতে দেয়নি। তবে চক্রান্ত থেমে থকেনি।  দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য পরবর্তীতে আমরা দেখলাম, তাদের একজনকে দিয়ে আর একজনকে রাজনীতি থেকে মোটামুটি মাইনাস করে দেওয়া হলো। গত দশ বছর বেগম খালেদা জিয়া কার্যত রাজনীতি থেকে মাইনাস হয়ে আছেন। মজাকরে অনেকে বলে, এখনতো বিএনপি ও তার নেত্রী জাদুঘরে চলে গেছেন। আর বাকী আছেন একজন!

রাজনীতির অংক যারা ভালোবাসে তাদের মাথায় জটিল যে সমীকরণটা বর্তমানে ঘুরপাক খাচ্ছে তা হলো- মাইনাস ওয়ান এর সাথে আর একজন প্লাস হয়ে কী মাইনাসে প্লাসে জিরো হবে। না প্লাস ওয়ান এর সাথে আর একজন মুক্ত হয়ে প্লাস হয়ে টু হয়ে স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরে আসবে। যদিও সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর তৃতীয় কোন পক্ষের পক্ষে ক্ষমতা গ্রহণকরার দ্বার রুদ্ধকরা হয়েছে, তবে প্রশ্ন থেকেই যায়। 

রাজনীতির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত জটিল ও অদ্ভূত। অদ্ভূত কারণ, বর্তমান সংসদে রয়েছে অদ্ভূত ধরণের গৃহপালিত বিরোধী দল। ফলে সরকারের কাজের বিরোধিতা বা দ্বিমত  পোষণ করার মতো সংসদে কেউ নেই। তাই নির্বচনকালীন সরকারেও বিরোধী দল বলে কিছু থাকবে না। জটিল কেননা, আমাদের রাজনীতিবিদদের নিজেদের মধ্যে যে সন্ধেহ ও অবিশ্বাস তা দূর হয়নি। নির্বাচনে সুক্ষ্ম কারচুপি, স্থুল কারচুপি, ভোট চুরি ও ডাকাতির সাথে নির্বাচনে নতুন অনুসঙ্গ হলো ‘খুলনা মডেল’। সাথে মরার উপড় খাড়ার ঘা আরেক আতঙ্কের নাম ‘ইভিএম’ ।  

এই অবস্থায় কী হতে চলেছে দেশে? কথায় আছে বদ্ধঘরে বন্দী বিড়াল বাঘের চেয়েও ভংঙ্কর। বিএনপি ও সরকার বিরোধীরা যদি দেখে তাদের সামনে ক্ষমতায় যাওয়ার কোন রাস্তায় খোলা নেই, তবে তারা যেকোন কিছুই করতে পারে। যা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক নাও হতে পারে।  আবার কম গণতন্ত্র ও বেশী উন্নয়ণের যে ধারণা ক্ষমতাসীনদের কাছ থেকে প্রতিনিয়ত পাওয়া যায়, সে পথেও হতে পারে আমাদের দীর্ঘযাত্রা।    

গণতন্ত্রে নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তা হতে হবে অংশগ্রহণমূলক, অবাধ, সুষ্ঠ ও নিরপেক্ষ। আমাদের সংবিধান সকলের সমাধিকারের কথা বলে। তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। সরকার তার দায় কোনভাবেই এড়াতে পারে না। বিধানমতে, তফসিল ঘোষণার সাথে সাথে যেহেতু ইসি স্বাধীন ও নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারবে। তাই গৃহপালিত বিরোধী দল ছাড়া বিএনপিসহ দেশের সকল বিরোধীপক্ষ তাকিয়ে আছে আসছে অক্টোবর মাসের দিকে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে তারা রাজনীতির মাঠে নামবে। অনাগত জটিল সব রাজনৈতিক সমীকরণে বন্দি সময়টা জাতি হিসেবে আমরা ভালোভাবেই পার করতে পারবো আশা রাখি। প্রত্যাশা থাকবে ইসি শক্তিশালী ভুমিকা পালন করে জাতিকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটা নির্বাচন উপহার দিতে পারবে। বর্তমান গুমোট অবস্থার পরিবর্তন হয়ে আসছে অক্টোবরেই হবে, সে পথে নবযাত্রা। 


নীতি ও নীতিমালাহীন রাজনীতি

সহজ কথা যায় না বলা সহজে। কিন্তু আমাদের বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ সহজ কথা সহজভাবে বলে থাকেন সবসময়। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চ্যান্সলর হিসেবে দেওয়া বক্তৃতার জন্য, সময়ের সবচেয়ে আলোচিত চ্যান্সলর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫০তম ও এবারের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সবটুকু আলো তিনি তাঁর অতিসরল বক্তৃতা দিয়ে নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন। আমার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সবচেয়ে বোরিং অংশটা হলো সমাবর্তন বক্তৃতা শোনা। আমি নিজে ২০০৯ সালে অনুষ্ঠিত ৪৫তম সমাবর্তনে অংশগ্রহণ করে ডিগ্রি নিয়েছি। আমাদের সময় সমাবর্তন বক্তা ছিলেন ১৯৮৬ সালে রসায়নে নোবেল বিজয়ী ইমেরিটাস অধ্যাপক ইউয়ান টি.লি। মনে আছে প্রধান বক্তার বক্তৃতা কোনমতে শুনে ছেড়ে দে মা কেঁন্দে বাঁচি অবস্থায় আমরা শারীরিক শিক্ষাকেন্দ্রের খেলার মাঠ ত্যাগ করেছিলাম। তবে এক্ষেত্রে ৫০তম ও ৫১তম সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীরা ভাগ্যবান বলতে হবে। এই দুই সমাবর্তনে অংশগ্রহণকারীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সলর মো. আবদুল হামিদের বক্তৃতা সরাসরি শোনার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।    

৫০তম সমাবর্তনে তাঁর আলোচিত বক্তৃতার চুম্বক অংশ ছিল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন আসলাম ভর্তি হবার জন্য তখন ভর্তিতো দুরের কথা ভর্তির ফরমটা পর্যন্ত আমাকে দেওয়া হলো না। আল্লার কী লীলা খেলা বুঝলাম না, যে ইউনিভার্সিটিতে আমি ভর্তি হতে পারলাম না, সেই ইউনিভার্সিটিতে আমি চ্যান্সলর হয়ে আসছি। আর এবারের ৫১তমর চুম্বক অংশ হলো, গরিবের বউ নাকি সবারই ভাউজ। এহন রাজনীতি হয়ে গেছে গরিবের বউয়ের মতো। এখানে যে-কেউ যেকোন সময় ঢুকে পড়তে পারে। কোন বাধা-বিঘœ নাই।    

আসন্ন একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে নানান শিল্পপতি, ভগ্নিপতি, আমলা, বিভিন্ন পেশাজীবীদের রাজনীতিতে অনুপ্রবেশ সম্পর্কে রাষ্ট্রপতি কথাগুলো বলেছেন। দেশে চলমান নির্বাচনে এমপি পদপ্রার্থীদের প্রচারনার ধরণ যদি আপনি লক্ষ্য করেন, তাহলে দেখবেন হঠাৎ দলের কোন শাখা সংগঠনের সহ-সম্পাদক পদের অধিকারীদের গণসংযোগ আর নির্বাচনী মহড়ায় রাজনীতির চেনা মাঠ হঠাৎ উত্তাল। আবার পুলিশের সাবেক আইজিপি নূর মোহাম্মদ এর মতো অনেক সাবেক আমলাও গণসংযোগ শুরু করেছেন। সামাজিক যোগাযোগ ও গণমাধ্যমগুলোতে যে খবর আমরা পাচ্ছি তাতে দেখা যাচ্ছে, এবার জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫০ থেকে ৭০ জন সাবেক আমলা নির্বচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য নমিনেশনর ইঁদুর দৌড়ে নামবেন। জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের শরিক দল জাতীয় পার্টি আওয়ামী লীগের কাছে কিংবা যুক্তফ্রন্ট বা জাতীয় ঐক্যের নেতারা বিএনপির কাছ থেকে এতোগুলো আসনের নমিনেশন দাবি করতে পারবে কিনা সন্দেহ। মহামান্য রাষ্ট্রপতি যাদের কথা বলেছেন, তারা নমিনেশন চাইতেই পারেন। সাধারণ মানুষের ধারণা হলো, শিল্পপতিরা চাঁদা দেয়, আমলারা রাজপথ ফাঁকা রাখতে সাহায্য করে, পেশাজীবীরা নিজ পেশার মূল দায়িত্ব ও কর্তব্য বাদ দিয়ে সারাজীবন দলের চাটুকারিতায় ব্যস্ত থাকে আর পরিবারতন্ত্রতো উপমাহাদেশের রাজনীতির প্রধান বৈশিষ্ট্য। এই যে বিশৃঙ্খলা তার অন্যতম প্রধান কারণ হলো রাজনীতিতে নীতি ও নীতিমালার অভাব রয়েছে। 

আমাদের দেশের রাজনীতিতে সব সময় নীতির বড় অভাব পরিলক্ষিত হয়। উদাহরণ হিসেবে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথায় ধরা যাক। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে এক সময় আওয়ামী লীগ ও জামায়াত যুগপৎ আন্দোলন করেছে। ২৭ জুন, ১৯৯৪ সালে সংসদ ভবনে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে দলদু’টি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের রূপরেখা ঘোষণা করে। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া ওই রূপরেখাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে ঘোষণা করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, একমাত্র পাগল ও শিশু ছাড়া কোন মানুষের পক্ষে নিরপেক্ষ হওয়া সম্ভব নয়। যে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য আন্দোলন করেছিল তারাই সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে আর যে বিএনপি এই ব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক ও অবাস্তব বলে উড়িয়ে দিয়েছিল তারা আজ তা পুনবহালের জন্য সংগ্রাম করছে।   

আবার, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে আওয়ামী লীগসহ আন্দোলনরত রাজনৈতিক দলগুলো তৎকালীন স্বৈরাশাসক হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের উপাধি দিয়েছিল, বিশ্ব বেহায়া। সেই বিশ্ব বেহায়া স্বৈরাশাসক ও তার দল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বগলদাবায় অবস্থান করছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত। স্বৈরাচার এরশাদ বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ দূত আর তাঁর দল সংসদে কথিত অদ্ভূত গৃহপালিত বিরোধী দল। আবার বিএনপির বিরুদ্ধে যে জামায়াত এক সময় আওয়ামী লীগের সাথে যুগপৎ আন্দোলন করেছিল, তারা আজ বিএনপির সাথে মিলেমিশে একাকার, হরিহর আত্মা। যুক্তফ্রন্ট, জাতীয় ঐক্য, অন্যসব বাম-ডান, ছোট দল, ইসলামী দল সম্পর্কেও নীতিহীনতার হাজারও উদাহরণ দেওয়া যায়। অতিসম্প্রতি সাবেক রাষ্ট্রপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও তাঁর দলকে বাদ দিয়ে যে নাটকিয়তার মধ্যদিয়ে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ গঠিত হলো, তা থেকে রাজনীতিবীদ ও রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিবোধের গভীরতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে প্রশ্ন জাগা অমূলক নয়।
  
আমাদের সকলের হয়তো মনে আছে, গণজাগরণ মঞ্চ আন্দোলনের বিপরীতে হেফাজতে ইসলামী নাস্তিক প্রতিরোধে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচি ঘোষণা দিয়েছিল। সংগঠনটির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা কথিত তেঁতুল হুজুর শাহ আহমদ শফী সম্প্রতি তাঁর এক বক্তৃতায় বলেছেন, লোকে বলছে, আমি নাকি আওয়ামী লীগ হয়ে গেছি? আওয়ামী লীগ হলে ক্ষতি কী? আসলে নীতিহীনতা ও ডিগবাজি হলো আমাদের দেশে রাজনীতির অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। আর যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে সেই দলের মাঠপর্যায় থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত সব ধরণের কমিটিতে পদ বানিজ্য এই সমস্যাকে প্রকট করে তোলে। বিত্তবান ও সুযোগ সন্ধানীরা সবসময় ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকতে চায়। আর রাজনৈতিক দলগুলোর নীতিহীন রাজনীতি তাদেরকে স্বর্থ চরিতার্থ করার সুযোগ তৈরী করে দেয়। ফলে প্রকৃত ও ত্যাগী রাজনৈতিক নেতা-কর্মীরা ক্ষমতার মাঠে মার খায়।       

স্বর্ণ চোরাচালান নিয়ে দেশে সব সময় কথা হয়। আমাদের ঢাকা ও চট্টগ্রামের বিমানবন্দর দু’টিতে সারা বছর যে পরিমান স্বর্ণ ধরা পড়ে, অনেক স্বর্ণ উৎপাদনকারী দেশে একবছরে ঐ পরিমাণ স্বর্ণ উৎপাদন হয় না। অনেকে মজা করে বলেন, এদু’টো বিমানবন্দর হলো আমাদের স্বর্ণ খনি। অনেক দিন পর দেশে স্বর্ণ নীতিমালা প্রনয়োণ করা হয়েছে। রাজনীতিরও নীতিমালা হওয়া খুব জরুরি। আমাদের দেশেও আমেরিকার মতো দলগুলোর নিবন্ধিত ভোটারের ভোটের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী ও এমপি প্রার্থী বাছায়ের ব্যবস্থা করতে হবে। নিয়ম করা জরুরী, রাশিয়ার মতো আমাদের দেশেও টানা দুই মেয়াদের বেশী কেউ প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতি থাকতে পারবেন না। সবধরণের কমিটিতে নিবন্ধিত কর্মীদের প্রত্যক্ষ ভোটে কমিটি গঠন করতে হবে। একজন ব্যক্তি টানা দুই মেয়াদের বেশী কোন নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সভাপতি বা অন্য পদে থাকতে পারবেন না। সকল ধরনের কমিটির ক্ষেত্রেও এই নিয়ম নির্ধারণ করতে হবে। একটা দলের ছাত্র সংগঠন থেকে শুরু করে টানা দশ বছরের কম সদস্যপদ ধারীদের কোন ধরণের নির্বাচনে দল থেকে মনোনয়ন দেওয়া যাবে না।

নীতিমালা তৈরীর কাজ ইসিকেই করতে হবে। তারও আগে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সচ্ছ গণতন্ত্র চর্চার ব্যবস্থা করতে হবে। হাত দেখিয়ে সভাপতি নির্বাচন করার সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ইসি, রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের অংশীজনদের সাথে আলাপ আলোচনা করে যদি দেশে রাজনীতির জন্য একটি নীতিমালা করতে পারে, তা হলে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে শৃঙ্খলা আসবে। আর রাজনৈতিক দলগুলো নিজেরা গণতন্ত্র চর্চা না করে যদি দেশে মুক্ত গণতন্ত্র চর্চার পরিবেশ আশা করে তা হবে, বোকার স্বর্গে বাস করা।   

এই উপমহাদেশে একটি কমন সমস্যা হলো, আমরা ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে পার্থক্য করতে ভুলে যায়। ফলে আমাদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোও কালপরিক্রমায় ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রতিষ্ঠানের রূপ ধারণ করে। এই অবস্থা থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। দেশের সর্বক্ষেত্রে প্রকৃত নৈতিকতা ও গণতন্ত্র চর্চা পারে, আমাদের প্রকৃত মুক্তি দিতে। আমরা উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা নিয়ে উন্নত দেশ হওয়ার মহাসড়কে হাঁটা শুরু করেছি।তাই টেকসই গণতন্ত্র ও উন্নয়নের স্বার্থে তা শুরু করতে হবে এখনই।       

ইভিএম ইতিবৃত্ত

দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বচন দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে। বিএনপি এবারও নির্বাচনে না এলে কী হবে? তা নিয়ে হয়তো হাজারো প্রশ্নের অবকাশ থাকবে। তবে নির্বাচন যে হবে, তা বলা যায়। সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের অদ্ভুত বিরোধী দলের নেতা দিল্লি সফর শেষে দেশে ফিরে জানিয়েছেন, বিএনপি নির্বাচনে না এলে তারা ৩০০টি আসনে প্রার্থী দেবে। এ থেকে মোটামুটি ধরে নেওয়া যায়, বিএনপি ছাড়া নির্বাচনে প্রতিবেশী ভারত রাষ্ট্রের সম্মতি আছে। আর এখন আমাদের দেশের উপর ভারতের প্রভাব উপলদ্ধি করার জন্য বিশেষজ্ঞ হতে হয় না। 

আর আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে এখন সবচেয়ে বড় আলোচ্য ইস্যু হলো- জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একশটি আসনে ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহন। এ নিয়ে দেশের সবখানে চলছে তুমুল আলোচনা। সরকারি দল বলছে, তারা ডিজিটাল বাংলাদেশের রূপকার ও প্রযুক্তিবান্ধব সরকার তাই নির্বাচনে তারা ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে। অপরপক্ষে বিরোধীপক্ষের অভিযোগ, ইভিএম মেশিন দ্বারা ভোট চুরি নয় ভোট ডাকাতি সম্ভব, সরকার ‘মেশিনে ভর’ করে ক্ষমতায় যেতে চাচ্ছে। আসলে কী এই ইভিএম মেশিন? আসুন জেনে নেয়া যাক-

মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ইলেকট্রনিক ভোটিং আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট প্রয়োগ বা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের স্বীয় মতামত প্রতিফলনের অন্যতম মাধ্যম। ভোট প্রয়োগে মেশিন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অণুসৃত হয় বিধায় সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নামে পরিচিত। এর অন্য নাম ই- ভোটিং। 

১৯৬৪ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ৭টি অঙ্গরাজ্যের নির্বাচনে সর্বপ্রথম ভোট গ্রহণে ইভিএম পদ্ধতির প্রয়োগ হয় বিশ্বে। এরপর থেকে বিশ্বের নানা দেশে ইভিএম এর মাধ্যমে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। আমাদের দেশে ভোট গ্রহণে ইভিএম প্রথমবার ব্যবহার করা হয় ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। এরপর ২০১১ সালে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পরে নরসিংদী পৌরসভা ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহৃত হয়।  গতবছর রংপুর, এবছর খুলনা , গাজীপুর, ররিশাল, রাজশাহী ও সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে সল্পপরিসরে ইভিএম ব্যবহার করে ভোট গ্রহণ করা হয়েছে। 

বিশ্বে এখন পর্যন্ত যেসব দেশ ইভিএম ব্যবহার করেছে সেগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, বেলজিয়াম, ব্রাজিল, এস্তোনিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি, ইটালি, আয়ারল্যান্ড, নেদারল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, নরওয়ে, পেরু, রোমানিয়া, ভেনেজুয়েলা, ফিলিপাইন, ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়ন। আর্জেন্টিনা, মেক্সিকো, স্পেন, সুইডেন ও দক্ষিণ আফ্রিকাসহ বেশকিছু দেশে এই ব্যবস্থা নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।

আমাদের দেশে আমরা কথায় কথায় ভারতের উদাহরণ দেই । ভারত ১৯৭৭ সালে প্রথম ইভিএম চালু করে। ১৯৯৮ সালে দেশটিতে ইভিএম ব্যবহার নিয়ে রাজনৈতি দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। আর ইসি লোকসভার ৫৪৩ আসনেই ইভিএম ব্যবহার করে নির্বাচন করে ২০০৪ সালে। এক্ষেত্রে ভারত ইভিএম প্রযোগ করার জন্য সময় নিয়েছে ২২ বছর। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হওয়ার পর ইসি সময় নিয়েছে ৬ বছর।   

আর আমাদের দেশে, গত বছর অংশীজনদের সঙ্গে ইসির সংলাপে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ ৭ টি দলের দবি ছিল নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের। বিপরিতে বিএনপিসহ ১২টি দল ইভিএম ব্যবহারের বিপক্ষে মত দিয়েছিল। স্পস্টত বলা যায়, এ বিষয়ে এখনও দেশে রাজনৈতিক ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এরমধ্যে কমিশন দেড় লাখ ইভিএম কেনার অনুমোদন দিয়েছে । বিয়ষটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ( সিইসি) কে এম নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। এর জন্য ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে এই ইভিএম কেনা হবে।   

এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি হলো ইভিএমে কি আসলেই ভোট কারচুপির সুয়োগ আছে? যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রায় হ্যাকিং করে পাল্টে দেওয়া হয়েছিল বলে ডেমোক্র্যাট দলের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয় । রাশিয়ার হ্যাকাররা নাকি চীনা হ্যাকাররা একাজ করেছে এ নিয়ে এখনও বিতর্ক চলছে। ২০০০ সালের মার্কিন নির্বাচনে বিতর্কিত ভোট গনণা ও বুশের কাছে আল গোরের হেরে যাওয়ার ঘটনাকেও আমরা স্মরণ করতে পারি। নির্বাচনে হার মেনে নিয়ে আল গোর বলেছিলেন, ‘আমাদের গণতন্ত্রের শক্তি ও গণঐক্যের স্বার্থে আমি রায়টা মানছি মাত্র।’ তবে তিনি সব ভেট হাতে গণনার দাবি করেছিলেন। 

ভারত বিশ্বের বৃহৎ গণতান্ত্রিক দেশ ও তাদের আছে মেরুদন্ডসহ ইসি। সেখানেও ইভিএম নিয়ে আছে নানা অভিযোগ। বহুজন সমাজ পার্টির প্রধান মায়াবতী, দিল্লির মূখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, দিল্লির কংগ্রেস নেতা অজয় মাকেন অভিযোগ করেছেন ইভিএম-এ কারচুপি সম্ভব। উত্তরপ্রদেশের নির্বাচনের পর সংবাদ সম্মেলন করে মায়াবতী অভিযোগ করে বলেন, ‘ইভিএম যন্ত্রগুলিতে বড় ধরণের কারচুপি করা হয়েছে, যার ফলে শুধু বিজিপি’র দিকেই ভোট চলে গেছে।’ ভারতে এখন কংগ্রেসসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো দাবি জানাচ্ছে, ইভিএম’র আর দরকার নেই। ভারতে আবার কাগজের ব্যালেটের মাধ্যমে ভোট নেওয়া হোক। 

জার্মানি, ইতালি, নেদারল্যান্ডস, আয়ারল্যান্ড ইভিএম ব্যবহার বন্ধ করেছে। আর আমরা কোনরকম দীর্ঘমেয়াদী পূর্বপ্রস্তুতি ছাড়াই জাতীয় নির্বাচনের মতো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বচনে ইভিএম ব্যবহার করতে যাচ্ছি। যদিও এখনও এখানে অনেকগুলি যদি আছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার ( সিইসি ) কে এম নুরুল হদার মতে,‘আইনের সংশোধনী পাস হলে এবং সবার সমর্থন পেলে আগামী জাতীয় নির্বাচনে দৈবচয়নের ভিত্তিতে কিছু আসনে ইভিএম ব্যবহারের চেষ্টা করবেন তারা।’ তাহলে শেষ সময়ে এসে কেন কমিশন ইভিএম বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। 

নেপালে বিমসটেক সম্মেলনে যোগদান শেষে গণভবনে সংবাদ সম্মেলন করে প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা দিয়েছেন, নির্বাচন হবে কেউ ঠেকাতে পারবে না। কিছুটা সংশয় থাকলেও দেশের মানুষও অধীর আগ্রহে বসে আছে  তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করার জন্য। রাজনৈতিক দলগুলোও তাদের নিজেদের মতোকরে কৌশল সাজাচ্ছে ক্ষমতায় যাওয়ার আশায়। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সহায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে যাবে কিনা সেটা ভবিষ্যত বলবে। তবে তাদের সামনে অন্যকোন বিকল্প আছে বলে আমার জানা নেই। যদি যেকোন পরিস্থিতিতে বিএনপি ও তার শরিকরা নির্বাচনে আসে, তাহলে তা হবে আমাদের গণতন্ত্রের জন্য মঙ্গলজনক। নির্বাচনের আর খুববেশি দিন বাকী নেই। এমন পরিস্থিতিতে নির্বচন কমিশনের শক্তিশালী ভূমিকা দেশবাসী আশাকরে। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের মতো অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি না করে ইসির উচিত আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কিভাবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক করা যায় সেদিকে মনোযোগ দেওয়া। সরকারের ইচ্ছাপূরণের দিকে অধিক মনযোগী না হয়ে ইসি দলনিরপেক্ষ ও স্বাধীনভাবে কাজ করুক এটাই সকলের প্রত্যাশা।  



ইভিএম না ই-ভোটিং মোবাইল অ্যাপ?

দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বচন দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে এখন সবচেয়ে বড় আলোচ্য ইস্যু হলো- জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহন। এই ইভিএম ইস্যু ভবিষতেও আমাদের পিছু ছাড়বে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আসলে কী এই ইভিএম মেশিন? আসুন জেনে নেয়া যাক-

মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ইলেকট্রনিক ভোটিং আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট প্রয়োগ বা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের স্বীয় মতামত প্রতিফলনের অন্যতম মাধ্যম। ভোট প্রয়োগে মেশিন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অণুসৃত হয় বিধায় সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নামে পরিচিত। এর অন্য নাম ই-ভোটিং। 

মূল কথা হলো আমরা দেশে ই- ভোটিং পদ্ধতি চালু করতে চাচ্ছি। এরমধ্যে নির্বাচন কমিশন দেড় লাখ ইভিএম মেশিন কেনার অনুমোদন দিয়েছে । বিয়ষটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ( সিইসি) কে এম নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। এর জন্য ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে এই ইভিএম কেনা হবে। 

এখন প্রশ্ন হলো এই যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইভিএম মেশিনগুলো কেনা হবে, এর কী কোন বিকল্প নেই আমাদের কাছে? অবশ্যই আছে। এর বিকল্প যে সম্ভাবনার দুয়ার আমাদের সামনে উন্মক্ত তাহলো-বৈশ্বিক মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন জিএসএমএ এর ‘মোবাইল ইকোনমি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, আমাদের দেশে একক বা ইউনিট  মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ৮ কোটি। বর্তমানে দেশে প্রতি চারজন মোবাইল ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন স্মার্ট মোবাইল ব্যবহার করে। অর্থাৎ ২৫ শতাংশ মানুষ স্মার্ট মোবাইল ব্যবহার করে। ২০২০ সালের মধ্যে স্মার্ট মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬০ শতাংশে উন্নত হবে। তখন দেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৯ কোটি ৬০ লাখ। এদের ৬০ শতাংশ মানে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি ম্মার্ট মোবাইল ব্যবহারকারী থাকবে ২০২০ সালে দেশে। আর এটা মোটামুটি নিশ্চিত স্মাটফোন ব্যবহারকারী মাত্রই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী। 

প্রযুক্তির এই যুগে বিশাল এই স্মাটফোন ব্যবহারকারীদের আমরা কাজে লাগাতে পারি। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে আমরা সূচনা করতে পারি ই-ভোটিং যুগের। 

আমার প্রস্তাব হলো: “নির্বাচন কমিশন একটা ই-ভোটিং মোবাইল অ্যাপ তৈরী করুক। যে অ্যাপ এর মাধ্যমে একজন বাংলাদেশী ভোটার পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে নির্বাচনে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।” এই অ্যাপের নাম দিতে পারেন-‘আমতলা’।  

যেভাবে তা কাজ করবে:

১. ভোটার: প্রক্রিয়াটিতে দেশে দু’রকম ভোটার থাকবে। প্রথমত ‘ট্রেডিশনাল ভোটার’ ও দ্বিতীয়ত ‘ই-ভোটার’। ট্রেডিশনাল ভোটার প্রচলিত ভোটপ্রদান পদ্ধতিতে ভোট দিবে। যারা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভোট দিতে চাইবে, তারা ই-ভোটার হিসেবে বিবেচিত হবে। কেবলমাত্র একজন ভোটার নিজ উদ্যোগে ই-ভোটার হতে পারবে। তাকে কেউ জোর করবেনা। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের সব ভোটারকে ই- ভোটারে পরিণত করার টার্গেট নিয়ে ইসি কাজ করবে।   

২. নিবন্ধন বা সাইন-আপ: উক্ত ই-ভোটিং অ্যাপ একজন ভোটার তার মোবাইলে প্রথমে ডাউনলোড করবেন। এবং তাতে নিবন্ধন করবেন অর্থাৎ ফেসবুকের মতো তার সব ইনফরমেশন দিয়ে সাইন-আপ করবেন। এক্ষেত্রে তিনি তার ব্যক্তিগত ন্যাশনাল আইডি কার্ড, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল আইডি ব্যবহার করে নিবন্ধিত হবেন। এবং নির্বাচন কমিশন অফিসে গিয়ে তিনি তার ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলিয়ে এসে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। প্রবাসীরা বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে গিয়ে ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলিয়ে আসবেন। এবং তিনি ‘ই-ভোটার’ হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হবেন।  

৩. ভোট প্রদান: ই-ভোটার সবসময় অনলাইনেই ভোট দিবেন। তিনি কখনও স্বশরীরে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিবেন না। এক্ষেত্রে একটা ভোট কেন্দ্রে ট্রেডিশনাল ভোটার ও ই-ভোটার দুই ধরণের ভোটার থাকবে। ট্রেডিশনাল ভোটারা স্বশরীরে কেন্দ্রে এসে ভোট দিবে আর ই-ভোটাররা অনলাইনে। 

৪. ভোটের দিন ফ্রি ইন্টারনেট: ভোটপ্রদান সময়টুকুতে দেশে ফ্রি ইন্টারনেট সেবা চালু থাকবে। প্রত্যেক মোবাইল অপারেটর কোম্পানি তা প্রদান করবে। একজন ই-ভোটার তার নিবন্ধিত মোবাইলফোনে এই ফ্রি ইন্টারনেট সেবা পাবেন।  

৫. লগইন: অ্যাপে দুই ধরনের লগইনের সুযোগ থাকবে। একটা ই- ভোটারের জন্য অপরটি ইসির জন্য। ইসি এই অ্যাপে শুধু ই-ব্যালেট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু আপলোড দিতে পারবে ও ফলাফল দেখতে পারবে ও প্রিন্ট দিতে পারবে। ইসি কোন কিছু ডিলিট করতে পারবে না। 

৬. ই-ভোটারের ভোট প্রদান প্রক্রিয়াটি যেমন হবে-

ভোটের আগের দিন ইসি ই-ভোটারের নিবন্ধিত মোবাইলে এসএমএস ও ই-মেলের মাধ্যমে ই-ভোটারকে ভোটদানের সময় , তার কেন্দ্রের নাম ও কোড নম্বরসহ প্রয়োজনীয় সব ইনফরমেশন প্রদান করবেন। 

ভোটের দিন প্রথমে ই-ভোটার তার ন্যাশনাল আইডি কার্ড নম্বর ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর অথবা ই- মেইল আইডি ব্যবহার করে অ্যাপে লগইন করবেন। ফেসবুকে যেভাবে আমরা লগইন করি। এরপর লগইন নিশ্চিত ও ভোটপ্রদান প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য অ্যাপ থেকে সংক্রিয়ভাবে একটি ভেরিফিকেশন কোড ই-ভোটারের নিবন্ধিত মোবাইল অথবা ই- মেইল ঠিকানায় আসবে। ভেরিফিকেশন কোডটিই হবে তার পরবর্তী পাসওয়ার্ড। কোডটি ব্যবহার করেই কেবলমাত্র ভোটদান প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। এতে করে একজনের ভোট অন্যজন কোনভাবেই দিতে পারবে না। 

৭. ব্যালট পেপার: অ্যাপে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে হুবুহু কাগজের ব্যালট পেপারের মতো ই-ব্যালট পেপারে ই-ভোটার ভোট দিতে পারবেন। একাধিক ব্যালট পেপার হলে একটার পর একটা ই-ব্যালট পেপারে ই-ভোটার ভোট দিবেন।  এবং তা সংক্রিয়ভাবে গণনা হয়ে যাবে। ই-ব্যালেট পেপারে ভোট নষ্ট হবার কোন সুযোগ থাকবে না।  

৮. ফলাফল ঘোষণা: ভোটের দিন ই-ভোটার নির্দিষ্ট সময়ে তার ভোটপ্রদান কার্য সম্পাদন করবেন। প্রবাসী ভোটাররা বাংলাদেশের লোকাল টাইম অনুসরন করে ভোট দিবেন। এই ব্যবস্থায় আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি প্রবাসীরাও দেশের সব নির্বাচনে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।   

ভোট শেষে প্রতিটি কেন্দ্রের পেপারের ভোট আর ই-ভোট মিলায়ে ফল ঘোষনা করা হবে। নির্বচনী এজেন্ডের সামনে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী কর্মকর্তা অ্যাপ লগইন করে ই-ভোটের ফলাফল প্রিন্ট করে  দেখাবেন ও ট্রেডিশনাল ভোট ও ই-ভোট যোগকরে  চুড়ান্ত ফলাফল  ঘোষণা করবেন। 

৯.ভবিষ্যত: ২০২০ সালে যদি দেশের ৬০ শতাংশ মোবাইল ব্যবহারকারী স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে এবং এধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালে দেশের শতভাগ মানুষের হাতে স্মার্ট ফোন থাকবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তি মতে তখন আমরা উন্নত দেশে পরিণত হব। আর তখন যদি আমরা আমাদের সকল ভোটারকে ই-ভোটারে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে ভোট গ্রহনের জন্য আমাদের বর্তমানের মতো সুচ-সুতা থেকে হাজার রকম জিনিস লাগবে না। তখন দেশে ভোট হবে অনলাইনে। ফলে ভোটের দিন হাজার হাজার ভোট কেন্দ্র থাকবে না তাই ভোট কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট প্রদানের প্রশ্ন আসবে না। ভোটের সময় সেনা মোতায়নের মতো দাবি নিয়ে কাদা ছুড়াছুড়ির প্রয়োজন পড়বে না। সহায়ক সরকারও লাগবে না। নির্বাচনে নির্বাচনী এজেন্টসহ এতো মানুষ লাগবে না। নির্বাচনে এতো হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে না। এমনকি  নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকও লাগবে না।  

ঐ সময় নির্বচন কমিশন ভোটের দিন নিরাপদ একটা হলরুমে লাইভ ভোট প্রদান কার্যক্রম দেখানোর ব্যবস্থা করবেন। জাতীয় নির্বাচনে ইসির প্রধান কার্যালয়ে ৩০০টি আসনের জন্য ৩০০টি বড় মনিটরে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম লাইভ দেখাবেন। যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দলের প্রধানগণ কোন রকম যোগাযোগ ডিভাইস ছাড়া উপস্থিত থেকে লাইভ ভোটগ্রহণ দেখবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটা নির্বাচনী আসনের জন্য একটা। আর স্থানীয় সরকার নির্বচনের সময় উপজেলা নির্বাচন অফিসে লাইভ ভোটগ্রহণ কার্যক্রম দেখানোর ব্যবস্থা করবেন। যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন অর্থাৎ প্রার্থীগণই শুধু উক্ত হলরুমে কোন রকমের যোগাযোগ ডিভাইস ছাড়া নির্বাচনে দায়িত্বপ্রপ্ত অফিসারদের সাথে অবস্থান করে লাইভ ভোট প্রদান কার্যক্রম দেখবেন। এক্ষেত্রে ভোটারের ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের শেষের তিনটি ডিজিট গোপন রেখে দেখানো হবে তিনি কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন।  যেমন আমরা ফেসবুকে একটা ছবি শেয়ার করলে দেখতে পাই কে কে তাতে লাইক দিচ্ছে। এক্ষেত্রেও বিষয়টি সে রকম হবে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতীকগুলো পরপর থাকবে এবং প্রাপ্ত ভোট প্রতীকের নিচে উঠতে থাকবে ও অটো গণনা হতে থাকবে। ভোটদানের সময় শেষ হওয়া মাত্রই রিটারনিং কর্মকর্তা ফল ঘোষণা করবেন।

হলরুমে বসে প্রার্থী লাইভ দেখতে পারবে তাকে কে কে ভোট দিচ্ছে। ছবি ও জাতীয় পরিচয় পত্রের তিন ডিজিট গোপন রাখার ফলে প্রার্থী ভোটারকে চিনতে পারবেন ঠিকই তবে বাকী ১৪ ডিজিট দেখে আসল ভোটের নিশ্চয়তা তিনি নিশ্চিত হতে পারবেন। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন প্রার্থী বা দলীয় প্রধানগণ হল রুম থেকে বের হতে পারবেন না। বাইরে থেকেও কেউ হলরুমে প্রবেশ করতে পারবে না।  

প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সবসময় ভিন্নমত থাকবেই। এটাই নিয়ম। মানুষ পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। তবে এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটা হবে তা হলো হ্যাকিং। আমার কথা হলো অ্যাপেল কোম্পানি যদি হ্যাকিংমুক্ত সফটওয়্যার তৈরী করতে পারে তাহলে জাতি হিসেবে আমরাও তা পারবো। 

এই ব্যবস্থায় দেশ ও দেশের বাইরের সকল প্রবাসী ভোটারকে ভোটদানের সুয়োগ করে দেওয়া যাবে। আমাদের সংবিধান যেহেতু দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়টি স্বীকার করে। তাই এই ব্যবস্থায় সংবিধানিক অঙ্গকারও পূরণ করা সম্ভব হবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুবিধা চালু হলে বাংলাদেশী সব নাগরিক কোন ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিতে পারবো। ২০২০ সালের মধ্যে সাড়ে ৫ কোটি ভোটারকে যদি আমরা ই-ভোটারে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে আমাদের নির্বচন খরচ বর্তমানের অর্ধেকে নামিয়ে আনা যাবে। আর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের ই-ভোটিং প্রদ্ধতি আমরা যদি সফলভাবে চালু করতে পারি তাহলে তা পৃথিবীর বুকে অনন্য নজির স্থাপিত হবে। এটা হতে পারে  ভোটগ্রহণে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ মডেল। বর্তমানের মানি না মানব না সংস্কৃতি থেকেও আমরা মুক্তি পাব। নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন কী?




কবিতা

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে আমি তোমাকে এঁকে ফেলি।   তোমার ছবি তখন আমার সাথে কথা কয়। তখন মায়াপুরিবেলা ভাসতে আর ভাসাতে নেই কোন মানা,   ...