রবিবার, ২১ অক্টোবর, ২০১৮

তাল তল্লাশি

ছোটবেলায় মায়ের বাঁধানো খাতায় গোটা অক্ষরে লেখা অথবা স্কুলে সুর করে আবৃত্তি করা কবিগুরুর কবিতা,‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে,সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে। মনে সাধ, কালো মেঘ ফুঁড়ে যায়, একেবারে উড়ে যায়, কোথা পাবে পাখা সে...।’ আসলেই তাই হাতপাখা হওয়া যার নিয়তি উড়বার পাখা সে কোথায় পাবে । প্রচন্ড গরমে তালপাতার হাতপাখার বাতাস দেহ-মন শীতল করে। ‘তালের পাখা প্রাণের সখা, গরমকালে হয় যে দেখা’ কিংবা ‘তালের পাখার এমনই গুণ, বাতাস খেলে আসবে ঘুম’এমন অনেক ছড়া লোকমুখে প্রচলিত আছে আমাদের দেশে। এগুলো যে শুধু কথার কথা নয় তীব্র গরমে তা উপলব্ধি করা যায়। ইলেকট্রনিক্স চার্জার ফ্যানের এ যুগে ‘বাতাসটা কর;বাতাসটা করে যা।’-ওমনি চাকর প্রকান্ড এক তালপাতার হাতপাখা নেড়ে কর্তাবাবুর গায়েমাথায় বাতাস দিচ্ছে,নাটকের এমন অনবদ্য দৃশ্য আর দেখা যাবে না । তবে স্কুলের শিক্ষকের হাতের তালপাখা ও তার হাতলের পিটুনি খাওয়ার স্মৃতি কেউ কেউ মনে করতে পারবে হয়তো । আসলে আমাদের জীবনের পরতে পরতে জড়িয়ে আছে তাল গাছ ।

তাল গাছ, যার বৈজ্ঞানিক নাম Borassus flabellifer,৩০-৪০ ফুট লম্বা হয় সাধারণত। শতবর্ষী এই গাছের পুরুষ ও স্ত্রী প্রজাতির মধ্যে শুধু স্ত্রী প্রজাতিই ফল দেয় এবং ফলের বেশিরভাগ অংশ জলীয়। এর শাঁস শরীরের কোষের ক্ষয় প্রতিরোধ করে, এমনকি ক্ষয় হয়ে গেলে তাও পূরণ করে। তাল অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট গুণসমৃদ্ধ হওয়ায় ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। পরম পরোপকারী এই বৃক্ষ জন্মের বছর পার না করতেই নিজেকে মানবসেবায় নিবেদিত করে।

তাল গাছের প্রতিটি অঙ্গ থেকেই কিছু না কিছু প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি হয়। এর পাতা থেকে তৈরি হয় হাতপাখা। আবার ঘর ছাওয়া, চাটাই, মাদুর, আঁকবার পট, লেখার পুঁথি কিংবা পুতুল তৈরিতেও ব্যবহার হয় তালপাতা। তাল গাছের কা- থেকে রস সংগ্রহ করা হয় এবং তা থেকে গুড়, পাটালি, মিছরি, তাড়ি (একপ্রকার চোলাই মদ) ইত্যাদি বানানো হয়। তালগাছ দিয়ে বাড়ি কিংবা নৌকা বানায় বিশ্বের বহু উপজাতি। আমাদের দেশে তালের গাছ দিয়ে তৈরি নৌকাকে বলা হয় ডোঙ্গা। দু-তিনজনের পারাপার, মাছ ধরা, ধান কাটা, শাপলা তোলা, শামুক সংগ্রহ, হাওর, বিল, বাঁওড়, পুকুর ও মাছের ঘেরে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয় ডোঙ্গা। এছাড়া নতুন রাস্তার ল্যান্ডস্কেপ, বাঁধ ও নদীর ভাঙন ঠেকাতে জিও টেক্সটাইল হিসেবে তালের ছোবরা থেকে তৈরি নেট/জালের সফল প্রয়োগ বিশ্বব্যাপী সৃষ্টি করেছে নতুন সম্ভাবনা। এটা মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে রোধ করে পরিবেশ বিপর্যয়। উঁচু গাছ হওয়ায় তাল গাছের পাতায় শিল্পের গাঁথুনিতে নান্দনিকতার বুননে নকশিজালের নীড় তৈরি করে নিরাপদ আশ্রয় বানায় বাবুই পাখি। শক্ত বুননের এ কুঁড়েঘর শিল্পের বড়াই করার মতো অপরূপ ঐশ্বর্য, যা প্রবল ঝড়-বৃষ্টির মধ্যেও ঝুলতে থাকে তালপাতার সঙ্গে। বাবুই ছাড়াও আরও অসংখ্য পাখির নিরপদ আশ্রয় তাল গাছ।

আমাদের দেশে কবিতা, গানে, কথায়, উপমায়, প্রবাদবাক্য, ছড়াসহ সাহিত্যের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে তাল গাছের ব্যবহার নেই । তালপাতার সেপাই, তাল বেতাল, তিলকে তাল করা, পিঠে তাল পড়া এমন অনেক উপমা রয়েছে বাংলা সাহিত্যে। কবি তার গ্রামের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন ‘ঐ দেখা যায় তাল গাছ, ঐ আমাদের গাঁ...’। গ্রামের মেঠো পথের ধারে কিংবা গ্রামের দিগন্ত বিস্তৃত ফাঁকা মাঠে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকা তাল গাছের সৌন্দর্য সবাইকে বিমোহিত করে। যদি কখনো চুয়াডাঙ্গা জেলার দামুড়হুদা উপজেলায় ডিসি ইকো পার্কে যাওয়ার সুযোগ হয় তাহলে এর প্রবেশ পথে দেখবেন একটি সড়ক, যার নাম ‘তালসারি’। এই সড়কের দু’পাশজুড়ে রয়েছে সারিবদ্ধ তাল গাছ। তাল গাছের দ্বারা শোভিত এমন সুন্দর সড়ক দেশের আর কোথাও আছে কি-না আমার জানা নেই। অবশ্য সুদৃশ্য এ সড়কটি তৈরির গল্পটিও বেশ চমৎকার অবিভক্ত বাংলার জমিদারি শাসনামলে ওই এলাকার প্রতাপশালী জমিদার নফর পাল চৌধুরীর স্ত্রী রাধারানী ইচ্ছা পোষণ করেন ছায়াঘেরা পথে কৃষ্ণনগর (পশ্চিম বাংলার একটি জেলা শহর) যাওয়ার। রাধারানীর ইচ্ছা পূরণ করতে নাটুদাহ থেকে কৃষ্ণনগর পর্যন্ত সড়ক ছায়া সুনিবিড় করার উদ্যোগ নেন জমিদার। তাঁর পরিকল্পনা সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন না হলেও প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়কের সঙ্গে এক কিলোমিটার পরপর ফলবাগান গড়ে তোলা হয়। এছাড়া সড়কের দুই পাশে বিভিন্ন জাতের গাছের চারা রোপণ করা হয়। তবে কালের পরিক্রমায় বিলীন হয়ে গেছে জাম, কুল, কাঁঠাল, লিচুসহ অনেক গাছের চিহ্ন। তবে রাধারানীর ইচ্ছা আর জমিদারের উদ্যোগকে স্মরণ করিয়ে দিতে পথের দু’ধারে কালের সাক্ষী হয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে তাল গাছগুলো। এই পাখি ডাকা, ছায়াঘেরা পথ যে কাউকেই মুগ্ধ করবেই। এতো গেল প্রেয়সীর ইচ্ছা পূরণের রোমান্টিক গল্প। প্রেমে ব্যর্থ হয়ে ‘আমি মেলা থেকে তালপাতার এক বাঁশি কিনে এনেছি, বাঁশি কই আগের মতো বাজে না, মন আমার তেমন কেনো সাজে না...’ গানটি গায়নি এমন বাঙালি যুবক বিরল।

বাঙালি ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাল গাছ। কিন্তু সমস্যাটা বাঁধে যখন এর মালিকানার নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কবিতার পরের লাইন যেহেতু ‘ওই খানেতে বাস করে কানা বোগির ছা..’। সে দীর্ঘদিন ধরে তালগাছে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছে, সেহেতু তালগাছের প্রকৃত মালিক হওয়ার কথা ছিল উল্লেখিত কানা বোগির বংশধরদের। কিন্তু তাল গাছের মালিক হওয়ার মূল লড়াইটা হয় মানুষের মধ্যে। বিভিন্ন জন ভিন্ন ভিন্ন সময়ে এর মালিকানা দাবি করে। আর যারা দাবি উপস্থাপন করে, তারা অঙ্গীকার করে যে তারা বিচার মানে। বিচার মানলেও তাল গাছের মালিক অন্য কেউ হয়ে যাবে, এটা তারা মানতে পারে না। আমাদের দেশের বাস্তবতায় ‘সব মানি কিন্তু তাল গাছটা আমার’ এই প্রবাদটি শুনেননি এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই তাল গাছ নিয়ে ঠেলাঠেলির ফলে আমাদের দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক জোট জাতীয় নির্বাচন নিয়ে কোনো ঐকমতে পৌঁছাতে পারে না। এমনকি জাতিসংঘ, ইইউ, দাতা সংস্থাসহ বিদেশি বন্ধুরাও তাল গাছের প্রকৃত মালিক কে তা ঠিক করে দিতে পারছে না। শোনা যাচ্ছে, আগামী নির্বাচনে তাল গাছটা কার হবে এ বিষয়ে সালিশ বসবে ইউরোপের কোন একটি দেশে। এরই প্রস্তুতি স্বরূপ মাঝে মাঝে দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের মুখ থেকে তাদের অবস্থান ও নতুন নতুন ফর্মুলা, ভিশন, নির্বাচনকালীন সরকার আরও কত কী গণমাধ্যমের কল্যাণে আমরা জানতে পারি। কিন্তু বাস্তবতার ভাঁড়ে ভবানী, এ দেশে অংশগ্রহণমূলক সাধারণ নির্বচন বাস্তবে অন্তঃসারশূন্য লোকগাঁথাই মনে হচ্ছে এখন পর্যন্ত।

সে যাই হোক, রাজনৈতিক কাদা ছোঁড়াছুঁড়ির ময়দান থেকে তাল গাছের সাম্প্রতিক গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো, বজ্রপাতে মানুষের মৃত্যু কমানোর জন্য দেশব্যাপী ১০ লাখ তাল গাছের চারা রোপণ করছে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়। গতবছর সংবাদমাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত বিষয় ছিল দেশে বজ্রপাতে চার দিনে ৮২ জনের মৃত্যুর ঘটনা । সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থা নাসা ও মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সারা বিশ্বে মার্চ থেকে মে এই তিন মাসে সবচেয়ে বেশি বজ্রপাত হয় সুনামগঞ্জে। স্যাটেলাইট থেকে নেওয়া গত ১০ বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে নাসার বিজ্ঞানী স্টিভ গডম্যান নেতৃত্বে¡ একদল গবেষকের গবেষণায় উঠে এসেছে ভীতিকর এই তথ্য। বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে ২০১৪ সালে ৯১৮টি, ২০১৫ সালে ১ হাজার ২১৮টি এবং ২০১৬ সালে দেড় হাজারেরও বেশি বজ্রপাত আঘাত হেনেছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত সাত বছরে দেশে বজ্রপাতে ১ হাজার ১৫২ জন মারা গেছে। তবে বাংলাদেশ দুর্যোগ ফোরামের হিসেবে এই সংখ্যা ১ হাজার ৫৮৯ জন। এর মধ্যে গত বছর মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ, ২১৭ জন। অর্থাৎ বজ্রপাতে মৃত্যু বাড়ছে। আর বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এর শিকার হচ্ছে, জমিতে কর্মরত দরিদ্র কৃষক। এদেশে আর সব ক্ষেত্রে যা হয় এ ক্ষেত্রেও সেই একই ফর্মুলা, মৃত ব্যক্তির পরিবার পাবে নগদ ২০ হাজার টাকা আর আহত ব্যক্তি পাবেন ৫-১০ হাজার টাকা। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর তথ্য হলো, বজ্রপাতে আহত ব্যক্তির চিকিৎসার যথাযথ ব্যবস্থা আমাদের দেশের বেশিরভাগ হাসপাতালে নেই। অথচ গতবছর সরকার বজ্রপাতকে দুর্যোগ হিসেবে ঘোষণা করেছে। চলতি বছরেও এদেশে বজ্রপাতে মৃত্যুর মিছিল শুরু হয়ে গেছে, মে পর্যন্ত মারা গেছে ৬২ জন(মে ১৯,২০১৭, দৈনিক প্রথম আলো)। বছরের বাকি সময়ে মৃত্যুর মিছিলে আর কত জন যোগ হবে তা সময়ই বলে দেবে।

মৃত্যুর এই মিছিল ঠেকাতে থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামের অভিজ্ঞতার আলোকে বজ্রপাতে মৃত্যু কমাতে তাল গাছ রোপনের এমন সিদ্ধান্ত। মন্ত্রণালয়ের মতে, বজ্রপাতে মৃত্যু ঠেকানোর জন্য এটিই সবচেয়ে কার্যকর স্থানীয় প্রযুক্তি। আমাদের দেশে প্রচলিত ধারণা হলো, আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনো বড় গাছের ওপর পড়ত। যেহেতু বজ্রপাত এক ধরনের বিদ্যুৎ রশ্মি তাই গাছ হয়ে তা মাটিতে চলে যেত। এতে মানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। কিন্তু বর্তমানে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে দেশের প্রায় সর্বত্রই তালগাছসহ বড় বড় গাছের সংখ্যা অনেক কমে গেছে। এখন গ্রামের পর গ্রাম ঘুরলেও তালগাছসহ বড় আকারের কোনো গাছ দেখা যায় না।

অনেকের ভ্রান্ত ধারনা, তাল গাছ লাগানো অশুভ। দেরিতে ফল দেয় এ কারণে অনেকেই এটি রোপণ করেন না। তবে অবাক করা বিষয় হলো বেশির ভাগ মানুষ মধ্য কিংবা শেষ বয়সে এসে তালগাছ লাগাতে পছন্দ করেন। কেননা, তত দিনে সে বুঝে যায় ইহ লীলা সাঙ্গ হবে আর এই দুনিয়ার কিছুই সে সঙ্গে নিয় যাবে না। তাই দেরি না করে আসুন সকলে অন্তত একটি করে তাল গাছ লাগাই। আজকে লাগানো গাছটিই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের জন্য বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বৃদ্ধি পাওয়া কালবৈশাখী, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড়,বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় মাথা উঁচু করে বুক পেতে দেবে মানুষ আর বসতভিটা রক্ষায়। নিজের মাথায় প্রকৃতির বজ্রবানের আঘাত গ্রহণ করে এরা আমাদের অনাগত প্রজন্মের জীবন রক্ষা করবে। তাই দেশজুড়ে যত বেশি তাল গাছ বাংলার আকাশে উঁকি দেবে তত বেশি কমবে বজ্রপাতে মৃত্যুর ঝুঁকি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে আমি তোমাকে এঁকে ফেলি।   তোমার ছবি তখন আমার সাথে কথা কয়। তখন মায়াপুরিবেলা ভাসতে আর ভাসাতে নেই কোন মানা,   ...