শনিবার, ৮ অক্টোবর, ২০২২

কবিতা

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে

আমি তোমাকে এঁকে ফেলি।  

তোমার ছবি তখন

আমার সাথে কথা কয়।

তখন মায়াপুরিবেলা

ভাসতে আর ভাসাতে নেই কোন মানা,  

আমি তখন তোমার হাতটি ধরে

নির্জন ঝর্ণার পাড়ে বসি।

কত কথা বলি

কতভাবে কতআবেগে রাঙ্গাতে চাই

তোমাতে ডুব দিয়ে

ডুবসাঁতারে ভেসে যায়।

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে

আমার সাথে এমনটিই হয়

কবিতা না লিখে

আমি তুমি-আমিকেই লিখে ফেলি।

বুধবার, ৩ আগস্ট, ২০২২

আমি-তুমি-সে

কে আমি ?

কে তুমি ?

একাকার তুমি-আমি।

 

কে সে ?

কে সাঁই ?

কে তুমি  ?

কার আমি।

 

তুমি কার ? কার তুমি ?

মাঝে-মাঝে আমার তুমি।

 

একাকাশ তুমি-আমি।

ভুবনজোড়া আমার তুমি।

আমার পৃথিবী শুধু তুমি।

 

তুমি-আমি-সে

মিলবো কিসে,

ভয়ে কাঁপে বুক

যদি হও চুপ, পৃথিবী নিশচুপ।

 

তুমি আর আমি

মিলেমিশে আমি।

তুমি ছাড়া আমি, ধূধূ মরুভূমি। 

 

বাকী থাকে সে

মিলবো কিসে?

প্রেমে বাঁধি বুক, মিলনের সুখ। 

 

তুমি-আমি-সে

হাওয়ায় ভেসে,

চলো গান গায়

দিনের শেষে।

 

কে আমি ?

কে তুমি ?

একাকার তুমি-আমি।

বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০১৯

কবিরাজ

মুগ্ধতা

কবিরাজ তোমার কারিশমা বেশ
কৃষ্ণযাত্রাই পাই বিরহের রেশ।
কৃষ্ণ যে কামার কাঁকড়া ধরে
কালনাগিনী তাকে দুধ খাওয়াই আদর করে।
তোমার ইশারাই, শুধু তোমার ইশারাই
কালবোস বিশ্ব মৎস্যকন্যা প্রতিযোগিতায়
বিশ্ব মৎস্যকন্যা সুন্দরী নির্বাচিত হয়।
কুমির পোষা আর মুরগি পোষা এক কাজ না।
তোমার এক কথায়
কামচোর যুবক কামাখ্যায় ধ্যানে বসে
কাব্যচর্চা ছেড়ে কবি কবি ছেলেটা ছাগলের খামার গড়ে।
কিভাবে সবজির কোপ্তা বানাতে হয়?
তোমার কাছে শিখতে হবে।
সবজির কোপ্তা হয়?
তুমি বানালে নিশ্চয় হবে।
আমার দিকে তাকাও
প্রেমের সাগরে ডুবে যাবে।


অসংলগ্ন
১  
কবিরাজ তোমাকে ভীষন মনে পড়ছে আজ!
জাহাজ ভাঙ্গা আর জাহাজ বানানো এক কথা না।
কিভাবে পরে বাতাস খাওয়া যায়?
রোগীর অভাব আছে।
যখন চলে যাচ্ছি, তখন
আফসোস বলো না।
কারন তখন আমি সীমা থেকে বহু দূরে।
শুধু আমার দিকে তাকাও
আমি ফিরে যেতে পারবো না।

শনিবার, ২৭ জুলাই, ২০১৯

গুজব গুলিয়ে দিচ্ছে সব

জাতি হিসেবে বাঙালীকে বলা হয় হুজুগে। কোন বিষয় ও অবস্থা সম্পর্কে এদের তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে না পারার অক্ষমতা ঐতিহাসিক। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাপতি রবার্ট ক্লাইভের কাছে পরাজিত হলো। যুদ্ধের পর নৌকাযোগে পালায়নরত নবাব নাজিমপুরে বন্দী হলেন। বন্দী নবাবকে কোম্পানির সৈন্যরা মুর্শিদাবাদে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল। ঐ সময় রাস্তার দু’পাশে অসংখ্য মানুষ জড়ো হয়েছিল। তারা নবাবকে কিভাবে ধরে নিয়ে যাচ্ছে, এই তামাশা দেখতে এসেছিল। বলা হয়, যত লোক নবাবকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছিল, তারা যদি সবাই একত্রিত হয়ে একটা করে মাটির ডিলও ছুড়তো তাতেই তারা নবাবকে ছাড়িয়ে নিতে পারতো।

বাঙালী তা না করে, নবাবকে ধরে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য উপভোগ করেছে। রোজ রোজতো আর নবাব দর্শন হয় না। নবাবকে ধরে নিয়ে যাক, তাতে আমার কী? আমিতো নবাবকে দেখতে পেলাম। নিজের অতি তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র ব্যক্তি স্বার্থ ও চাওয়া পূরনের ইচ্ছা বাঙালী পরিত্যাগ করতে পারে না। নবাবের সময় মীরজাফর, রায়দূর্লভ, ইয়ার লতিফ, ঘষেটি বেগম, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ প্রমূখের ব্যক্তি স্বার্থের কাছে দেশের স্বার্থ পরাজিত হয়েছে। এদের চক্রান্তে ভারতবর্ষের পরাধীনতার শুরু ও ১৯০ বছরের ব্রিটিশ শাসনের সূচনা হয়। ব্যক্তি স্বার্থের কাছে দেশের স্বার্থ আজও প্রতিদিন পরাজিত হচ্ছে আমাদের স্বাধীন বাংলায় তথা বাংলাদেশে। 

সে সময় মীরজাফরদের ষড়যন্ত্র উৎসুক জনতা যেমন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখেছে আজও তাই করছে। তবে পার্থক্য একটা এসেছে। এখন জনতা তামাশা দেখার সাথে সাথে ঘটনার ভিডিও ধারণ করছে। ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে আহ্বান করছেÑএটাকে ভাইরাল করুন। এই ঘটনার বিচার হতেই হবে! ভাইরাল করুন! কিন্তু সভ্য সমাজের মানুষের সামনে সংগঠিত হওয়া অনাকাঙ্খিত ঘটনা প্রতিহত করার সবকটা প্রত্যক্ষ হাত আজ স্মার্ট ফোনের স্ক্রিনে বন্দী। 

স¤প্রতি বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে রিফাত শরীফকে প্রকাশ্য দিবালোকে কুপিয়ে হত্যা করা হলো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে আমরা দেখলাম, ঘটনার সময় অনেক যুবক সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল। তারা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে একজন তরুনকে কুপিয়ে হত্যা করার ঘটনা প্রত্যক্ষ করলো। কেউ রিফাতকে বাঁচাতে এগিয়ে আসলো না। রিফাতের স্ত্রী মিন্নি একাই শেষ পর্যন্ত প্রাণপণে চেষ্টা করেছে স্বামীকে বাঁচাতে। কিন্তু পারিনি। 

এই ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় উঠলো। এ কোন সমাজে আমরা বাস করছি! যেখানে প্রকাশ্যে মানুষ হত্যা, মানুষ কাছ থেকে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে! এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। এরা তাদেরই বংশধর যারা নবাবকে কোম্পানির সৈন্যদের ধরে নিয়ে যেতে দেখেছে। মীরজাফররাও আমাদের সমাজে প্রকাশ্য দাপটের সাথেই আছে। দেশের বিরুদ্ধে চক্রান্তের এদের নতুন হাতীয়ার মাদক। যুব সমাজের হাতে মাদক ধরিয়ে দিয়ে এরা নয়ন বন্ড তৈরী করছে ও ব্যক্তি স্বার্থ  হাসিলে ব্যবহার করছে।

রিফাত হত্যার এখনকার ঘটনা প্রবাহে আমাদের বর্তমান সমাজের আসল রূপ বেরিয়ে আসছে। বন্দুকযুদ্ধে নয়ন বন্ড নিহত। তার মানে-নয়নকে যে বা যারা নয়ন বন্ড বানিয়েছিল, তাদের সম্পর্কে আপনি আর কখনো জানতে পাবেন না। কুপানোর ঘটনার ভিডিও লক্ষ করলে দেখা যাবে, কালো শার্ট পরিহিত রিফাত ফরাজী সবচেয়ে বেশি কোপ মেরেছে। রিফাত ফরাজীর জন্য বন্দুকযুদ্ধের বিধান হয়নি। শোনা যায়,  তার নাকি নাতিকোটা আছে। স্বামীকে বাঁচানোর জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করা মিন্নি ফেঁসে গেছে। 

মিন্নির ভবিষ্যত পরিণতি যাতে সমাজে কোন প্রভাব না ফেলে সেজন্য প্রথম আলোর মতো পত্রিকাগুলো রিফাত হত্যার নিউজ করার সময় মিন্নির নাম সুকৌশলে শুধু আয়শা সিদ্দিকা লিখছে। মিন্নি নামটা আপনার হয়তো অনেক দিন মনে থাকবে কিন্তু আয়শা সিদ্দিকাকে আপনার ভুলে যাবার সম্ভাবনা আছে। তখন আলোচিত এই হত্যাকান্ডের চুড়ান্ত রায় হবে। নয়ন বন্ড তৈরীর কারিগদের নিয়ে তখন আপনি চিন্তাও করবেন না। 

সমাজ,রাষ্ট্র ও বিশ্বের ঘটনাপ্রবাহ মানুষ আগের চেয়ে অনেক বেশি নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করছে এখন। মানুষের হাতের মুঠোয় থাকা স্মার্ট ফোন সবার আগে তাকে যেকোন ঘটনার র ফুটেজ দেখার সুযোগ করে দিচ্ছে। ফলে ফিল্টার করা কোন কিছু মানুষ আর গ্রহণ করতে চাচ্ছে না। কিছুদিন আগে মাদক নির্মূল অভিযানে বিনাবিচারে অনেকের প্রাণ গেল। কিন্তু সাধারণ মানুষের মনের জিজ্ঞাসা, সাংসদ আবদুর রহমান ওরফে বদির কিছু হয়েছে? ক্ষমতাবানদের এদেশে কোন বিচার হবে না-চলমান ঘটনাপ্রবাহ মানুষের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে। দেশে বিচার পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো ভোগান্তিতো আছেই। 

ফলে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের মাথা লাগবে-এই গুজব, এখন ডেঙ্গু জ্বরের চেয়েও আতঙ্কের নাম। মাথা লাগার গুজব কিভাবে ছড়ালো? এর ব্যাখ্যায় বাংলাদেশ পুলিশ যা বলেছে, পদ্মা সেতুতে কর্মরত একজন চাইনিজ বলেছিলেন- ‘উই নিড মোর হেডস’ যার বাংলা অর্থ হলো-আমাদের কাজের জন্য আরো লোক দরকার। এখান থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। এরপর দেশে ছেলেধরা আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। 

ছেলেধরার আতঙ্ক আমাদের দেশে আগেও ছিল। বেশি দুষ্টমি করলে ছেলেধরা ধরে নিয়ে যাবে। এই ভয়, ছোট বেলায় আমাদেরও দেখানো হয়েছে। ছেলেধরাই ধরবে- এই আতঙ্কে আমি নিজেও আতঙ্কিত থাকতাম। আমাদের বাবা-মা কি এমনি এমনিই আমাদের এই ভয় দেখিয়েছে? এর পিছনে কী কোন কারণ নেই? প্রতিটি ঘটনার আগে ও পরে অনেক ঘটনা থাকে ও ঘটে। দেশে গুজব কি একদিনেই তৈরী হলো।   

মধ্যপ্রাচ্যে উঠের জকি হিসেবে রোবট ব্যবহারের আগে জকি হিসেবে ছোট শিশুদের ব্যবহার করা হতো। যাদের অধিকাংশই বাংলাদেশ,ভারত,পাকিস্তান,আফগানিস্তান ও সুদান থেকে পাচার হয়ে যেত। এখনও প্রতিনিয়ত আমাদের দেশ থেকে নারী ও শিশু পাচার হচ্ছে। যেসব নারীরা পাচার হয়ে যাচ্ছে তাদের অধিকাংশের স্থান হচ্ছে পতিতালয় নামক নরকে। 

নিকট অতীতের কয়েকটা গুজবের কথা বিবেচনায় নেয়া যাক। টাক মানুষের ও কালো বিড়ালের মাথায় ম্যাগনেট অর্থাৎ চম্বুক আছে। এই চম্বুকের অনেক দাম। ব্রিটিশরা মাঠে যে ম্যাগনেট পুতে রেখেছে তার দাম কোটি টাকা। হুতম পেঁচার অনেক দাম। কয়েক লক্ষ টাকা। দেড়শ গ্রামের একটা ‘হাঁস পা’ তক্ষকের দাম হাজার কোটি টাকা। বায়ার নিজে হেলিকপ্টারে চড়ে এসে কিনে নিয়ে যাবে। রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার আশায় অনেকে মাঠে নেমে পড়লো নিরীহ প্রাণী শিকারে। 

কোটি টাকার আশায় দেশের কৃষি জমিতে ব্রিটিশ আমলে পুতে রাখা বজ্র বিদ্যুত শোষক যন্ত্রগুলো রাতারাতি পাচার হয়ে গেল। এখন বৃষ্টির সময় মাঠে কাজ করার সময় প্রতিনিয়ত আমাদের কৃষকরা বজ্রাঘাতে মারা যাচ্ছে। পাচার রোধে দেশে দেখার কেউ নেই। প্রতিবছর দেশ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।      

তক্ষক ও হুতোম পেচার অতিমূল্য গুজবে প্রতারণার নগ্ন প্রকাশ ঘটেছিল। টার্গেট ক্রেতা তক্ষক বা পেঁচা কেনার পর, সে সেগুলো আর বিক্রি করতে পারিনি। ফলে সর্বশেষ ক্রেতা লোকশানের মুখে পড়েছে। দেশের শেয়ার বাজারেও একই কায়দায় টাকা লুটে নেওয়া হচ্ছে। ক’দিন আগে শেয়ার বাজার থেকে সাতাশ হাজার কোটি টাকা উধাও হয়ে গেছে। সপ্তদশ শতাব্দীতে নেদারলেন্ডে ‘টিউলিপ মেনিয়া’র সময়ও একই ভাবে প্রতারণা করা হয়েছে। অধিক মুনাফার লোভ দেখিয়ে পরিকল্পিতভাবে লোকজনকে ঠকানো হয়েছে।    
           
বাংলাদেশে সবাই কোটিপতি হতে চায়। এটা একটা সাধারণ প্রবণতা। কোটিপতি হবার জন্য যে সাধনা ও পরিশ্রম দরকার তা কেউ করতে চায় না। সবাই বড়লোক হবার জন্য মোটামুটি একটা শর্টকাট পন্থা খোঁজে । ফলে এদেশে প্রতরণা করা ও গুজব ছড়ানো সহজ। শুধু বললেই হলো, এটার দাম কোটি টাকা। কোন কিছু বিবেচনা না করেই কান নিয়ে গেল চিলে ঘটনার মতো সবাই ঝাপিয়ে পড়বে। 

এই সুযোগে, ঘোলা জলের মাছ শিকারীরা মাছ শিকার করে নেবে। চুয়াডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা নূরানি হাফিজিয়া মাদ্রসা ও এতিমখানার ছাত্র আবির হুসাইনের মাথাবিহীন লাশ আমাদের স্তম্ভিত করে দিয়েছে। হুজব নিয়ে শত প্রচারণার মধ্যেও এমন ঘটনা ঘটল? আবির হত্যা ঘটনা সম্পর্কে আমরা যা জানতে পারছি, উক্ত মাদ্রাসার সুপার বা মুহতামিম আবু হানিফ শিশুটিকে দীর্ঘদিন ধরে বলৎকার করছিল। তার এই অপরাধ যাতে প্রকাশ না পায় সেজন্য গুজবের সুযোগ নিয়ে সে শিশুটিকে গলাকেটে হত্যা করেছে। নেত্রকোনায় শিশু সজিব মিয়ার সাথেও একই রকম ঘটনা ঘটেছে। সেখানে খুনি রবিন গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে। খুনিকে দ্রুত গ্রেপ্তার করে চুয়াডাঙ্গা পুলিশ এক্ষেত্রে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছে। 

গুজব শুধু খারাপ মানুষই ছড়ায় না। ভালো মানুষদেরও গুজব ছড়ানোর পুরানো ইতিহাস আছে। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে পোপ গ্রেগরী নবম ঘোষণা দিলেন, কালো বিড়াল শয়তানের দূত হিসেবে পৃথিবীতে আসে। ফলে লক্ষ লক্ষ কালো বিড়ালকে হত্যা ও পুড়িয়ে মারা হলো। ঐ সময় ইউরোপের অনেক অংশে কালো বিড়াল বিলুপ্তপ্রায় হয়ে যায়। বাস্তবতা হলো, কোন সমাজেই গুজবের কারণে নিরীহ কালো বিড়াল বা মানুষ হত্যার বিচার হয় না। 

মাথা লাগার গুজব, বিদ্যুত না থাকার গুজব, শেয়ার দিলে নিশ্চিত তিনটি সুখবর পাবেন-এমন অসংখ্য গুজব আমাদের মাথাকে গুলিয়ে দিচ্ছে। অবাধ তথ্য প্রবাহের এই যুগে তা থেকে আমাদের মুক্তি নেই। দেশে চলমান ঘটনা প্রবাহে নিরীহ মানুষই গণপিটুনির শিকার হচ্ছে বেশি। ঢাকায় বাচ্চার স্কুলে ভর্তির খবর নিতে গিয়ে ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে নিহত হয়েছে রানু নামের এক মা। রানুকে সাপের মতো পিটিয়ে মারার ভিডিও আমরা সামাজিক যোগাযোগে দেখেছি। ঘটনার সময় বানুর অসহায় চাহনি আমাদের অসহায় করে দিয়েছে। বর্তমান সমাজ ও রাষ্ট্রে আমরা কত অসহায়ভাবে বেঁচে আছি। রানু তার না বলা অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে আমাদের চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে গেছে। 

মানুষের জীবনের নিরাপত্তা ও জীবন ধারণের সুন্দর ও স্বাভাবিক পরিবেশ নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। কোন দেশের সরকারই এই দায় এড়াতে পারে না। আমাদের দেশের বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। চলমান গুজব নিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয় গুজবের কারখানা’। তাহলে বিষয়টা দাঁড়ালো, ওনারা সব ধোয়া তুলসী পাতা। যত দোষ নন্দ ঘোষ। অন্যের ওপর দোষ চাপিয়ে নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি অবহেলার সংস্কৃতি আমাদের দেশে অবশ্য নতুন না। এই সুযোগে প্রকৃত অপরাধীরা এদেশে সবসময় অধরাই থেকে যায়।    



              

শনিবার, ২০ জুলাই, ২০১৯

ধর্ষণ বন্ধে চাই সামাজিক আন্দোলন

মানুষ যখন থেকে আগুনের ব্যবহার শিখলো তখন থেকেই তার সভ্যতার মহাসড়কে পথচলা শুরু। আগুন অবিস্কার ও তার ব্যবহার মানুষকে তার মস্তিস্ককে কাজে লাগাতে শিখিয়েছে। বলা চলে, ভালো-মন্দো বিচার বিবেচনা করতে পারার দক্ষতা মানুষ ঠিক তখন থেকে রপ্ত করেছে। মানুষ তার বুদ্ধিমাতাকে কাজে লাগিয়ে প্রকৃতিকে জয় করেছে। পৃথিবীকে নিয়ে এসেছে হাতের মুঠোয়। সভ্যতার উন্নতির চরম শিখরে উন্নত মানুষ নিজের বুদ্ধিমাত্তাকে কাজে লাগানোর পাশাপাশি কৃত্তিম বুদ্ধিমাত্তাকে কাজে লাগাচ্ছে। পশু শিকার সমাজ থেকে আজ আমরা গ্লোবাল ভিলেজ সমাজে বাস করছি। কিন্তু আদতে সভ্যসমাজে বসবাসরত মানুষ কী সভ্য হয়েছে? বিশেষ করে পুরুষেরা? পুরুষেরা কী তার স্বাভাবিক বিচার বুদ্ধি কাজে লাগাতে পারছে? 

স¤প্রতি দেশ ব্যাপী ধর্ষণের ঘটনাগুলো বিবেচনাই নিলে তা মনে হয় না। ঘটনার ভয়াবহতায় আতকে উঠতে হয়। কী হচ্ছে দেশে! ধর্ষণের ঘটনাকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যখন কোন নারী লেখে- কুকুরের কার্তিক মাস শেষ হয় কিন্তু পুরুষের লালসার জিভের জল শেষ হয় না। তখন পুরুষ হিসেবে বড্ড বেশী অসহায় লাগে। ধর্ষক আর কুকুরের মধ্যে কোন পার্থক্য আসলেই কী করা যায়? উভয়ই কাম তাড়িত হয়ে হিতাহিত শুন্য উন্মত্ত জানোয়ার। বস্তুত, পাশবিকতা ও মানবিকতা দু’টিই মানুষের বৈশিষ্ট্য। পাশবিকতা জয় করে মানুষ যখন মানবিক হয়ে ওঠে তখনই মানুষ নিজেকে প্রকৃত মানুষ বলে দাবি করতে পারে। মানবিক বোধ শুন্য মানুষ আর পশুর মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বাংলাদেশে অবস্থা দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে মানুষের মধ্যে মানবিকতা বোধ ভয়াবহ হারে লোপ পাচ্ছে।    

দু’টি ঘটনা বিবেচনায় নেয়া যাক। প্রথমটি-চুয়াডাঙ্গায় চকলেট দেওয়ার লোভ দেখিয়ে ছয় বছরের এক মেয়ে শিশুকে ধর্ষণ করেছে ৫৫ বছরের নরপশু আবদুল মালেক। ঘটনার সময় মালেকের বাড়ি ছিল মহিলা ও মানুষ শুন্য। অপরটি-মাগুরায়। স্বামী বাড়ি না থাকায় এক মা তার শিশু সন্তানকে নিয়ে নিজ বাসায় রাত্রি যাপন করছিল। এই সুযোগে একই গ্রামের দিপুল, মাজেদুল ও আশরাফুল নামধারী তিন নরপশু মহিলাটিকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। প্রথম ঘটনায় চুয়াডাঙ্গা পুলিশ প্রশাসনের তৎপরতা ও সফলতা চোখে পড়ার মতো এবং তা প্রশংসার দাবি রাখে। দ্বিতীয় ঘটনায় মাগুরার শ্রীপুর থানার ওসি মহিলাটির মামলা না নিয়ে উল্টো নির্যাতিতার বিরুদ্ধে মামলা ঠুকে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে থানা থেকে বিদায় করেছেন। দু’টি ঘটনায় প্রশাসনের দুই রকম ভূমিকা থাকলেও একটা বিষয়ে চরম মিল আছে। তাহলো, পরিবেশ ও সুযোগ অনুকূলে আসা মাত্রই পুরুষগুলো পশুতে পরিনত হয়েছে।  

ধর্ষণ বৃদ্ধি পাবার বহুবিধ কারণ অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে-দেশে যৌন শিক্ষা মূলত সমবয়সী বন্ধু কেন্দ্রিক। এই উপমহাদেশে না পরিবার-না শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোথাও যৌনতা নিয়ে কথা বলার পরিবেশ নেই। ফলে বন্ধুদের কাছে শোনা যৌনতার জ্ঞান একধরণের ফ্যান্টাসি তৈরী করছে। ফলে কোন পিয়ার গ্র“পের একজন ধর্ষণ করার অভিজ্ঞতা লাভ করলে অন্য সদস্যদের মধ্যেও তা করার প্রবনতা বৃদ্ধি পায়। যৌনতা সম্পর্কে প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষা প্রযোজন। একথা দেশের নীতিনির্ধারকরা ভাবেন বলে মনে হয় না। ফলে দেশে শিক্ষিত থেকে অক্ষর জ্ঞনশুন্য সকলেই একই পন্থায় যৌন শিক্ষা লাভ করছে। ফলাফল, সচিব থেকে শ্রমিক কে নেই ধর্ষকের তালিকায়। আত্মীয়তা ও রক্তের বাঁধনও এক্ষেত্রে কাজে আসছে না। ধর্ষকের মিছিলে বাবা-শ্বশুর,চাচা-মামা-খালু,কাজিন সবাই সামিল হচ্ছে। এক্ষেত্রে উচ্চ শিক্ষিতদের শিক্ষাও কোন কাজে আসছে না। কলাবাগান থেকে ক্যান্টনমেন্ট, নিজ গৃহ থেকে চলন্ত গাড়ি কোথাও নারী আজ নিরাপদ না। 

ইন্টারনেট হলো যৌন শিক্ষার আর এক মাধ্যম। স্মার্ট ফোন সহজলোভ্য হওয়ায় তা মহামারী আকারে মানুষের হাতে হাতে ছড়িয়ে পড়েছে। বলা বাহুল্য, ইন্টারনেটে ভালো জিনিসের চেয়ে খারাপ জিনিসই বেশি শেখে মানুষ। এর সাথে যোগ হয়েছে দেশের গ্রাম থেকে শহরের অলিগলি সবখানে কম্পিউটারের দোকানে পর্ণগ্রাফির রমরমা ব্যাবসা। এসব দোকানে দশ টাকা দিয়ে যেকেউ স্মার্টফোন ভর্তি করে পর্নো ছবি আপলোড করে নিতে পারে। স্মার্টফোন যেহেতু সারাক্ষনের সঙ্গি তাই যখন খুশি তখন ফোনের মালিক এসব ছবি দেখার সুযোগ পাচ্ছে। ফলে এসব নীল ছবির দর্শকদের মনোবিকৃতি ঘটছে ও তাদের পশুর পর্যায়ে নামিয়ে আনছে। দেশে নিষিদ্ধ নীল ছবি বেচাকেনা বন্ধে কারও কোন বিকার নেই। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার সাবেক ইউএনও মোঃ শাহীনুজ্জামান একবার এই ব্যাবসা বন্ধে অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। এটাই সম্ভবত সবে ধন নীল মণি। দেশের অন্য আর কোন ইউএনও-ডিসি পর্নো ছবির বেচাকেনা বন্ধ করতে চান কিনা বা এ বিষটি তাদের নজরে আছে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ হয়। 

সবক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম মানুষকে গ্রাস করছে। মানব জীবনে এই মাধ্যমের প্রভাবকে আর অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। এই মাধ্যমে যে কোন ঘটনা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে নিমিষেই। ফলে কোথাও কোন ধর্ষণের ঘটনা ঘটলে অন্যরাও ঘটনার সাথে মনস্তাত্ত্বিকভাবে সংযুক্ত হয়ে যাচ্ছে। ধর্ষণের ঘটনাগুলোর সাথে মনস্তাত্ত্বিক যোগাযোগ অন্যদেরেও ধর্ষণে প্রলুব্ধ করছে। সাথে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য গ্র“পে যৌন উত্তেজনার     সুড়সুড়ি দেওয়া হচ্ছে প্রতিনিয়ত। ধর্মের দোহায় আজ আর কোথাও কাজে আসছে না। ধর্মীয় অনুশাসন মেনে না চলাও সমাজে ধর্ষণ বৃদ্ধিতে অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।   

রাজনীতি করলে আর দল ক্ষমতায় এলে অসীম ক্ষমতার অধিকারি হওয়া যায় এ দেশে। ক্ষমতাধরদের মধ্যে ধরাকে সরা জ্ঞান করার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রতিপক্ষের মা-বোনদের ধর্ষণ করে ক্ষমতা প্রকাশ করার বরবর সংস্কৃতি এ দেশে গড়ে উঠছে। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর পূর্ণিমা শীলকে বিএনপির খলিল, লিটন, আলতাফরা ধর্ষণ করে। কারণ, সকল হিন্দু নৌকায় ভোট দেয়। ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর নোয়াখালীর সুবর্ণচরে পারুলকে আওয়ামী লীগের রুহুল আমীন মেম্বর ও তার দলবল ধর্ষণ করে। কারণ, পারুলকে বলা সত্তেও সে ধানের শীষে ভোট দিয়েছে। ক্ষমতা উৎযাপনের এই পৈশ্বাচিক প্রবণতা যে কারণে গড়ে উঠছে তা হলো বিচারহীনতা। 

বিচারহীনতার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের যেন মুক্তি নেই। আনেকের মনে থাকার কথা ১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকারের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক জসিম উদ্দিন মানিক ক্যাম্পাসে মিষ্টি বিতরন করে ধর্ষণের সেঞ্চুরি উদযাপন করেছিল। সে ছিল বিশ্ববিদ্যলয়টির তৎকালীন প্রক্টরের ভাগ্নে। কথায় আছে, মামা ভাগ্নে যেখানে আপদ নেই সেখানে। এদেশে মানিকের বিচার হয়নি। রাষ্ট্রের দুর্বোলতার সুযোগ নিয়ে সে বিদেশে পালিয়ে নিরাপদ জীবন গড়েছে। 

কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের ভিতর সোহাগী জাহান তনু ধর্ষিত ও খুন হলো। বিচারতো দূরে থাক অবস্তাদৃষ্টিতে মনে হতে বাধ্য,‘ নো ওয়ান কিলড তনু’। চলন্ত বাসে কিশোরগঞ্জের তানিয়াকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাই এদেশে কোন সাড়া ফেলেছে বলে মনে হয়নি। অথচ ২০১২ সালে দিল্লিতে চলন্ত বাসে জ্যোতি সিংহ পান্ডেকে গণধর্ষণের ঘটনায় ভারতবর্ষ ফুসে উঠেছিল। ইন্ডিয়া গেটের সামনেসহ সারা ভারতে ঘটনাটির বিচার চেয়ে বিক্ষোভকারীরা বিক্ষোভ প্রদর্শনের করে। এই ঘটনার বিচার হয়েছে। অভিযুক্তদের ফাঁসি হয়েছে। ফেনীর নুসরাতকে যৌন হয়রানি ও পুড়ি হত্যার ঘটনায় আমরা শুধু হতবাক হয়েছি। আন্দোলন করার প্রয়োজন বোধ করিনি। 

সমাজে ছড়িয়ে পড়া অনাচার বন্ধে সকলকে সচ্চার হতে হবে। তা না হলে অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলারা আমাদের সকলকে একসময় পুড়িয়ে মারবে। দেশে বাড়তে থাকা ধর্ষণের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। তা করতে সামাজিক আন্দোলনের কোন বিকল্প নেই। পরিবার-সামাজসহ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের সর্বক্ষেত্রে আন্দোলন ছড়িয়ে দিতে হবে। দেশে বিচারহীনতার সংস্কৃতি দূর করতে হবে। একসময় আমাদের দেশে এসিড সন্ত্রাস মহামারী আকার ধারণ করেছিল। ‘এসিড অপরাধ দমন আইন, ২০০২’ এ এসিড নিক্ষেপের শাস্তি— মৃত্যুদন্ড করার পর এর প্রকোপ কমে এসেছে। 

সরকারী প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। ‘সত্যমেব জয়তে’ টিভি প্রোগ্রামের মাধ্যমে বলিউডের সুপারস্টার আমির খান শিশুদের ওপর যৌন হয়রানির চিত্র তুলে ধরার সাথে সাথে শিশুদের যৌন শিক্ষা দেওয়ার প্রয়াস করেছেন। সোহেল তাজ তার ‘হটলইন কমান্ডো’ প্রোগ্রামে এমনটি করলে আমরা খুশি হব। সবধরণের  গণমাধ্যমকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলনে গণসচেতনতা তৈরীতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে।  

সেঞ্চুরিয়ান মানিকের কান্ডকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্দোলনকে স্মরনে রাখতে ও আর যাতে কোন মানিক তৈরী না হয় এজন্য জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ২ আগস্ট ‘খুনি ও ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস’ পালন করা হয়। এই দিনটিকে জাতীয় দিবস হিসেবে ঘোষণা করে ‘জাতীয় খুনি ও ধর্ষক প্রতিরোধ দিবস’ হিসেবে পালন করা যেতে পারে। যৌন শিক্ষাকে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরের পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। সামাজিক আন্দোলন আর যথাযথ শিক্ষাই পারে ধর্ষণের অভিসাপ থেকে আমাদের মুক্তি দিতে। সাথে সবার আগে পুরুষকে মানুষ হওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করতে হবে।        
      
   

মঙ্গলবার, ৯ জুলাই, ২০১৯

বাংলাদেশ-ভারতের রাজনীতিতে এত মিল!

দু’টি দেশের রাজনীতিতে মিল খুঁজে পাবার ব্যপারটা বেশ কাকতলীয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তা অসম্ভব ঘটনা বটে। কেননা ভিন্ন ভিন্ন দেশের রাজনৈতিক পরিবেশ ভিন্ন। আবার একেক দেশের জনগণের সংস্কৃতি, রুচি ও মনন আলাদা। জীবনযাত্রার মান,আর্থ-সামাজিক পরিবেশ, রাজনীতিতে ব্যবসায়ী, মৌলবাদী ও জাতীয়তাবাদী শক্তির প্রভাব,টাকার প্রভাব,রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রভাবের মতো নানান বিষয় জাতীয় রাজনীতিকে প্রভাবিত করে। তাই দু’টি দেশের রাজনীতিতে মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে দেশ দু’টি যখন ভারতীয় উপমহাদেশের দু’টি দেশ তখন সেখানে মিল খুঁজে পাওয়া খুব সম্ভব। 
ভারত বিশ্বের বৃহত্তম সংসদীয় গণতন্ত্রের দেশ। দেশটি ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে আজ অবদি তার গণতান্ত্রিক স্বকীয়তা বজায় রেখেছে। একই সময় স্বাধীন হওয়া পাকিস্তান ও পাকিস্তান থেকে মহান  মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের মতো দেশটিতে গণতন্ত্র কখনও সামরিক শাসকদের দ্বারা হোঁচট খায়নি। এই অনন্য বৈশিষ্ট্য ভারতের গণতন্ত্রকে পৃথিবীর বুকে মর্যাদার আসন দিয়েছে। সেখানে আমাদের গণতন্ত্র এখনও হামাগুড়ি থেকে হাটি হাটি পা পা অবস্থায়।

গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় আয়োজনটির নাম নির্বাচন। আর এই নির্বাচনের মতো বৃহৎ কর্মটি পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশন দেশটির নির্বচন কমিশনকে একটা শক্ত ভিত্তির উপর দাঁড় করিয়ে গেছেন। ভারতের নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে কোন দলের প্রতি পক্ষপাতিত্ব করার অভিযোগের হার নগন্য। সেখানে আমাদের নির্বাচন কমিশনের অবস্থান উল্ট পথে উল্ট রথে। নির্বাচনের কথা বাদই দিলাম, এবছর সংস্থাটি রমজান মাসে ইফতার আয়োজন করে সকলের জন্য একই আইটেমের ইফতার পরিবেশন করতে পারিনি। 

গণতন্ত্রের মান ও ঐতিহ্যের কথা বাদ দিয়ে আমরা যদি দেশ দু’টির রাজনীতির স¤প্রতি ট্রেন্ড ও কর্মসূচির মধ্যে মিল খুঁজি তাহলে অবাক হব। আপনার মনে হতে পারে ভারতের নরেন্দ্র মোদি মনে হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ফলো করছে। আলোচনায় মিল খুঁজতে গিয়ে আমরা বাংলাদেশের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচন ও এর পূর্ব-পর ঘটনা প্রবাহের মধ্যে মিল মিলিয়ে দেখার প্রয়াস করবো। 

নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকা কালে রাজ্যটির ব্যাপক উন্নয়ন করার সাথে সাথে যা অর্জন করেন, তা হলো- গুজরাট দাঙ্গার কলঙ্ক। এই কলঙ্কের তিলক মাথায় নিয়ে তার ভারতের জাতীয় রাজনীতিতে উঠে আসাটা বিষ্ময়কর। এক্ষেত্রে যে ঘটনা তাকে জাতীয় জীবনে চালকের আসনে নিয়ে এসেছে, তা হলো- পশ্চিমবঙ্গের সিঙ্গুরে টাটা ন্যানো গাড়ির কারখানা স্থাপনের জন্য জমি নিয়ে ঘটা ঘটনা প্রবাহ। সিঙ্গুরে অনিচ্ছুক জমিদাতাদের জমি নিয়ে আন্দোলন জমিয়ে তুলে রাজ্যটির তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতা থেকে  ৩৪ বছরের বাম শাসন ছুড়ে ফেলতে সক্ষম হন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার সিঙ্গুরে টাটাকে তার চাহিদা মতো জমি দিতে ব্যর্থ হয়। রাজ্যটির এই দূর্বলতা মোদি লুফে নেন। গুজরাটের সানন্দে মোদি টাটাকে চাহিদা মতো জমি দেন কারখানা স্থাপনের জন্য, কোন রকম ঝামেলা ছাড়ায়। এই ঘটনায় ভারতের ব্যবসায়ী মহলে যে বার্তা ছড়িয়ে পড়ে তাহলো- মোদি কাজের লোক। নরেন্দ্র মোদি ভারতের শীর্ষ ব্যবসায়ীদের প্রথম পচ্ছন্দে চলে আসেন। 

আমাদের দেশের ঘটনা প্রবাহের প্রবাহ বিবেচনায় নেয়া যাক। ২০০১ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিতে বিএনপি রাষ্ট্র ক্ষমতায়। বিএনপির এই সরকারের প্রধান কলঙ্কের নাম হাওয়া ভবন ও হাওয়া ভবনের কমিশন বাণিজ্য। হাওয়া ভবনের পর আর যে ব্যক্তি তৎকালীন সরকারকে দেশের শীর্ষ  ব্যবসায়ীদের কাছে বিরক্তি প্রতিপন্ন করে তোলে সে হলো- তারেক রহমানের বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুন তথা খাম্বা মামুন। এই মামুনের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কাছে চাঁদা নেওয়ার বহু কাহিনি বিস্তারিত প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় দৈনিক গুলোতে। খাম্বা মামুন বিএনপির বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীদের কি পরিমান ক্ষেপিয়ে তুলেছিল তা একটা উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে। মামুনের স্কুল পড়–য়া মেয়ের শখ ছিল-প্রতিদিন নিত্য নতুন দামি গাড়িতে চড়ে স্কুলে যাওয়া। মেয়ের এই শখ মেটাতে সে ব্যবসায়ীদের বাধ্য করেছিল তার মেয়ের স্কুলে যাওয়া-আসার জন্য তাদের গাড়ি দিতে। গাড়ি দিতে বাধ্য করার ঘটনা মামুনের অন্যান্য ভয়াবহ অপকর্ম বোঝার জন্য যতেষ্ট।

সুতরাং বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের কাছে তৎকালীন বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা হয়ে ওঠেন বিকল্প আশ্রয়স্থল। ফলাফল-নবম জাতীয় সংসদ থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে নজীর বিহীন টানা তৃতীয় মেয়াদে তিনি রাষ্ট্র ক্ষমতায়। তার বর্তমান সংসদে ৬২ শতাংশের ওপরে সাংসদ ব্যবসায়ী। মজার ব্যাপার হলো, শেখ হাসিনার সময়ে বিএনপির ব্যবসায়ীরাও সরকারী অনেক উন্নয়ন কাজ পেয়ে, কাজের মধ্যে মহাব্যস্ত আছেন। এতো গেল উৎথানের ঘটনা। এখন রাজনৈতিক কর্মসূচি মিলিয়ে দেখা যাক। 

বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ভিশন হলো- ডিজিটাল বাংলাদেশ ও সোনার বাংলা বিনির্মান। ২০০৮ সালের ১২ ডিসেম্বর শেখ হাসিনা তার নির্বাচনী ইশতেহার ‘রুপকল্প-২০২১’-এ এই লক্ষ্যের কথা বলেন। অপরপক্ষে, নরেন্দ্র মোদি ২০১৪ সালের ১৫ আগস্ট ডিজিটাল ইন্ডিয়ার ঘোষণা দেন। তার সরকারের বর্তমান ভিশন হলো- ডিজিটাল ইন্ডিয়া ও নয়া ইন্ডিয়া বিনির্মান। কী অদ্ভূত মিল না! সোনার বাংলার জায়গায় নয়া ইন্ডিয়া।

২০০১ সালে জাতীয় নির্বাচনের আগে আমাদের দেশের দেওয়ালগুলো একটা চিকাই ভরে গিয়েছিল-শেখ হাসিনার সরকার আর একবার দরকার। আর ২০১৯ সালে এবার বিজেপি জোটের প্রধান স্লোগান ছিল-ফির এক বার মোদি সরকার। নবম সংসদের পর এখন আওয়ামী লীগের প্রধান স্লোগান- শেখ হাসিনা সরকার বারবার দরকার। আপনি নিশ্চিত থাকেন সামনে বার নির্বাচনে বিজেপির মূল স্লোগান হবে- বারবার মোদি সরকার।  

ডিসেম্বর’২০১৮ সালে একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে নভেম্বর’১৮ মুক্তি পায়-‘হাসিনা:অ্যা ডটার’স টেল’ সিনেমাটি। যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জীবনভিত্তিক পূর্ণদৈর্ঘ প্রামান্যচিত্র। আর মে’২০১৯ সালে সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনের আগে এপ্রিল’১৯ ভারতে মুক্তি পায় সিনেমা-‘পিএম নরেন্দ্র মোদী’। যা নরেন্দ্র মোদির বায়োপিক। একাদশ সংসদ নির্বচনের আগে চলচ্চিত্র ও ক্রিকেট তারকাদের নিয়ে ফটোসেশন করে জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী। মনে হতে পারে, নির্বাচনের আগে তার দেখানো পথে মোদিও একই কাজ করেছেন । যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভায়রাল হয়। 

সবাই আওয়ামী লীগের সদস্য হতে পারবে কিনা তা নিয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য নিয়ে দেশে অনেক আলোচনা হচ্ছে। সাথে চলছে আওয়ামী লীগের সদস্য সংগ্রহ ও নবায়নের কাজ। এই কর্মসূচী দলটি শুরু করে নবম জাতীয় সংসদে সরকার গঠন করার পর জানুয়ারি’২০১০ সালে। মজার মিল হলো বিজেপি ২০১৪ সালে দলের সদস্য বাড়ানোর জন্য ‘সদস্যপদ অভিযান’ শুরু করে। দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর ৬ জুলাই এই কর্মসূচী নরেন্দ্র মোদি আবার শুরু করেছেন, চলবে ১১ আগস্ট,২০১৯ সাল পর্যন্ত। এখানে মনে হতে পারে, দু’টি দল বোধহয় একই সময় একই কর্মসূচী বাস্তবায়ন করছে। 

আমাদের বর্তমান সংসদকে বলা চলে শেখ হাসিনাময় সংসদ। সংসদের বাকি সাংসদের অবস্থা প্রদীপের নীচে অন্ধকারের মতো। প্রজাতন্ত্রের সরকারী কর্মচারীর বদলির মতো সামান্যতম ঘটনায়ও প্রধানমন্ত্রীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়। একাদশ নির্বাচনের মতো বিতর্কীত নির্বাচনের পরও শেখ হাসিনার নেতৃত্বগুনে বর্তমান সংসদ কার্যকর সংসদে পরিণত হয়েছে। অপর দিকে, ভারতের এবারের লোকসভা নির্বাচনের প্রচারনায় শুধুমাত্র মোদিকে ফোকাস করে প্রচারণা চালানো হয়েছে। বিজেপির এবারের প্রচারণায় স্থানীয় নেতার ছবিই ব্যবহার করা হয়নি কোন কোন ক্ষেত্রে। পুলাওয়ামায়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ভারতীয় বিমান বাহিনীকে খারাপ আবহাওয়ায় সার্জিকাল স্ট্রাইক চালানোর মতো স্পর্শকাতর ও হটকারী সিদ্ধান্তটি মোদিই দিয়েছিলেন। 

জোটবন্ধ নির্বাচন উপমহাদেশের নির্বাচনের একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য। একাদশ জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের একক সংখ্যাগরিষ্টতা দলটির জোট-মহাজোটের অন্যান্য দলের অবস্থান ম্লান করে দিয়েছে। ভারতের সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনেও বিজেপির একক সংখ্যাগরিষ্টতা দলটির জোট-এনডিএ এর বাকি দলগুলোর ভূমিকা গুরুত্ব হারিয়েছে। এতো গেল সরকারী দল। বিরোধী দলের জোটগুলোর মধ্যেও অসম্ভব মিল আছে দু’টি দেশের রাজনীতিতে। আপনার মনে হতে পারে ভোটে হারার জন্য মনে হয় এরাও একে অপরকে ফলো করছে। একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি গঠন করে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ আর সপ্তদশ লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেসের গঠন করা জোট হলো ‘ইউপিএ’। দু’টি জোটিই নির্বাচনের আগে নিজ নিজ দেশের জনগণকে পরিস্কার করতে পারিনি-তারা জিতলে পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হবে। ফলে দুটি জোটেরই নির্বাচনে ভরাডুবি হয়েছে। 

নির্বাচনে হেরে রাহুল গান্ধী কংগ্রেসের সভাপতির পদ থেকে সরে যেতে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। নির্বাচনে হারার কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র তদের বিরুদ্ধে কাজ করেছে আর ভারতের মর্যাদাবান প্রতিষ্ঠান-নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষভাবে কাজ করেনি। রাহুল গান্ধী যথাযথ কারণ বলার সাথে সাথে শুধুমাত্র ড. কামাল হোসেনের মতো বলেননি, আমরা এই ফলাফল প্রত্যাখ্যান করছি এবং নতুন নির্বাচন দাবি করছি। পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যটিতে তার দলের হারের কারণ হিসেবে ভোট গ্রহণে ব্যবহৃত ইলেক্ট্রনিক ভোটিং মেশিনে(ইভিএম) বিজেপির পক্ষে প্রোগ্রামিং করা ছিল বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি হারের জন্য বিদেশী শক্তির হাত থাকতে পারে বলে সন্দেহ পোষণ করেছেন। বিরোধী দলগুলোর সন্দেহ ও তাদের হারের কারণগুলোর মধ্যে কী অসম্ভব রকম মিল-দেশ দু’টিতে, তাই না। 

আসলে বাংলাদেশ-ভারতে বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার দুটির মধ্যে মিলই বেশী। ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জিততে আওয়ামী লীগ ফোকাস করে ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা’ কে। যা আমাদের জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি। কট্টর জাতীয়তাবাদকে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যেতে খুব সুক্ষভাবে ও সফলভাবে ব্যবহার করেছে। আগের সংসদে স্বাধীনতা বিরোধী দু’জন রাজাকার মন্ত্রী থাকায় তাদের কৌশল কাজে দিয়েছে। আর ক্ষমতায় এসে তারা দেশে ভয়ের সংস্কৃতি চালু করেছে। আপনি যদি এই সরকারের বিরুদ্ধে যান-তাহলে আপনি রাজাকার। 

অপরপক্ষে, ২০১৪ সালে রাষ্ট্র ক্ষমতায় যেতে বিজেপির প্রধান অস্ত্র ছিল ‘হিন্দুত্ববাদ’ এর মতো কট্টর মৌলবাদ। বিজেপি ভারতকে হিন্দুস্থান হিসেবে চিহ্নিত করে হিন্দুত্ববাদকে ‘নয় জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে সফলভাবে জাতীয়তাবাদের জায়গায় প্রতিস্থাপন করেছে। বলার অপেক্ষা রাখেনা, কট্টর জাতীয়তাবাদ এখন বর্তমান বিশ্বের মানুষের প্রথম পচ্ছন্দ। ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’, ‘আমেরিকা ফাস্ট’ এর মতো কট্টর জাতীয়তাবাদের স্লোগান তুলে ডোনাল্ড ট্রাম্প আজ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। বিজেপিও ক্ষমতায় এসে ভারতকে ভয়ের রাজ্যে পরিণত করেছে। সংখ্যালঘুদের ওপর রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের(আরএসএস) ও গোরক্ষক কমিটির নির্যাতন ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিজেপির বিরোধীতা করলে-আপনি মুসলমান বা তাদের দালাল অথবা ভারতীয় নান। 

মজার ব্যাপার হলো, উভয় দেশের সরকারই জনগণকে বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের ছবি ও উন্নত বিশ্বে উন্নত হবার স্বপ্নে জনগণকে বিভোর করে রেখেছে। বাংলাদেশে আমরা ২০৪১ সালে উন্নত বিশ্বের দেশ হব, বুড়িগঙ্গা টেমস নদীর মতো রূপবতী ও সুন্দরী হবে। ওদিকে, ভারতে মোদি পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির মায়ারবাণী শুনাচ্ছেন। ভারত হবে বিশ্বের তৃতীয় অর্থনীতির দেশ। বাস্তবতা হলো, জনগণের খোলা জায়গায় মল ত্যাগ করার পরিসংখ্যানের দিক দিয়ে, বিশ্বে ভারতের অবস্থান প্রথম। ভারতে না থাকলেও বাংলাদেশে ‘কম গণতন্ত্র, বেশী উন্নয়ন’ এই ডিবেট প্রচলিত আছে। আশাকরা যায়, ভবিষ্যতে আমরা তা সফলভাবে দেশটিতে রপ্তানী করতে সামর্থ হব। ভারত যেভাবে আমাদের রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মসূচীকে ফলো করছে, এ আশা আমরা করতেই পারি।     

        

      


শুক্রবার, ৫ জুলাই, ২০১৯

মোদির নয়া ভারত, বিশ্বাস অর্জন বড় চ্যালেঞ্জ

নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদি পৃথীবীর বৃহত্তম সংসদীয় গণতান্ত্রিক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো শপথ নিয়েছেন। এবার তার সরকারের স্লোগান- সবকা সাথ সবকা বিকাশ সবকা বিশ্বাস। এই স্লোগানকে সামনে রেখে তিনি নয়া ভারত বিনির্মাণের ডাক দিয়েছেন। এর আগে ২০১৪ সালে ভারতের ষোড়শ সাধারণ নির্বাচনে জিতে ভারতের পঞ্চদশ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়ে তিনি স্লোগান দিয়েছিলেন-সবকা সাথ সবকা বিকাশ। 

প্রথম দফায় দেওয়া ওয়াদা তিনি সবটা রক্ষা করতে পারেননি। সবার বিকাশ তিনি সমানভাবে করতে পারেননি। এর প্রমাণ ভারতে ঋণভারে জর্জরিত কৃষকদের মধ্যে আত্মহত্যা করার ভয়ংকর প্রবণতা তিনি থামতে পারেননি। বিজেপি শাসিত মধ্যপ্রদেশের মন্দসৌরে কৃষিঋণ মকুবের দাবিতে বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে নিহত পাঁচজন কৃষকের আত্মা আমাদের একথায় বলে। দেশটিতে সংখ্যালঘু স¤প্রাদায়ের ওপর নির্যাতন অতীতের যেকোন সরকারের আমল থেকে বেড়েছে তার সময়। বিশেষ করে, গোরক্ষক কমিটি কর্তিক মুসলিম ও দলিত স¤প্রাদায়ের ওপর চালানো নির্যাতনের কথা না বললেই নয়। পিপলস ইউনিয়ন ফর ডেমোক্রেটিক রাইটস(পিইউডিআর) এর এক প্রতিবেদন মতে, ভারতে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১৮ সালের মার্চ পর্যন্ত গোরক্ষার নামে বাড়াবাড়ির মোট ১৩৭টি ঘটনা ঘটেছে, যাতে মৃত্যু হয়েছে ২৯ জনের। 

তার সরকারের আমলে ভারতে সংখ্যালঘু স¤প্রাদায়ের মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছে অতীতের যেকোন সময়ের চেয়ে। স¤প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হওয়া তারবেজ আনসারির নির্যাতন ও তাকে হত্যার ঘটনা তার বড় প্রমাণ। এই ধরণের আরও নির্যাতনের ঘটনা প্রতিনিয়ত ভায়রাল হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠির বিকাশে তার অবস্থান স্পস্ট নয়। এরসাথে মোদির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ হলো দেশের সংখ্যালঘু মানুষের ওপর ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে চলা নির্যাতন থামানো, তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ও সবার বিশ্বাস অর্জন করা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের বিশ্বাস তিনি কিভাবে অর্জন করেন তাও দেখার বিষয়। যেখানে এবার দ্বিতীয়বার নির্বাচনী বইতরনী পার হবার তার প্রধান ট্রামকাড ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চালানো সার্জিক্যাল স্ট্রাইক। 

নিকট অতীতে জাতীয় নাগরিকপঞ্জি(এনআরসি) তালিকা করে আসাম রাজ্যের চল্লিশ লক্ষ মানুষকে বাদ দেওয়া হয়েছে। যাদের অধিকাংশই বাংলাভাষী মুসলমান। এদেরকে সেখানে চিহ্নিত করা হচ্ছে ‘অবৈধ বাংলাদেশী’ হিসেবে। বিজেপির রাজনীতিবিদরা এদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে বলে ঘোষণাও দিয়েছেন ইতমধ্যেই। রোহিঙ্গাদের মতো ভারতও তার দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠিকে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠাবে কিনা সে ভাবনা বাংলাদেশের সচেতন মহলে শঙ্কা তৈরী করেছে। এছাড়া সীমান্তে হত্যা, বাণিজ্যঘাটতি, গঙ্গা, তিস্তা ও অন্যান্য অভিন্ন নদী অববাহীকায় বাংলাদেশকে তার ন্যয্য পানির হিস্যা না দেওয়ার মতো পুরাতন অবিশ্বাসতো আছেই। এগুলোর সাথে রোহিঙ্গা ইসুতে ভারতের অবস্থান তার বন্ধু রাষ্ট্র বাংলাদেশকে হতাশ করেছে।  

প্রতিবেশীদের সাথে ইন্ডিয়ার আচরণ- বিড়ালের সামনে বাঘ আর বাঘের সামনে বিড়াল, টাইপের। চীন সীমান্তে ভারতের সংযত আচরণ দেখলে আপনার নিজেরই বিশ্বাস হবে না এরাই বাংলাদেশ সীমান্তে প্রতিনিয়ত ফেলানীদের লাশ বানাচ্ছে। নেপালীদের ভারত সম্পর্কে অভিযোগের শেষ নেই। দুর্বল প্রতিবেশীদের সাথে ভারতের আচরণ বড় ভাই সুলোভ ও দাদাগিরি টাইপ। আয়তনে ভারত বিশাল তারপরও প্রতিবেশী স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে সবাই বন্ধুত্বসুলোভ আচরণ প্রত্যাশা করে। পাকিস্তানের সাথে ভারতের সম্পর্ক আন্তর্জাতিক অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কূটকৌশলের মারপেচে বন্দি। 

মালদ্বীপ, নেপাল, শ্রীলঙ্কার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের সরাসরি হস্তক্ষেপের অভিযোগ পুরনো। মায়ানমারের আন্তর্জাতিক সীমানা লঙ্ঘন করে দেশটির মাটিতে জঙ্গি দমনে অতীতে সার্জিকাল স্ট্রাইক চালিয়েছে ভারত। দেশটিতে তারা চীনের সাথে প্রভাববলয় বৃদ্ধির খেলায় লিপ্ত। আফগানিস্তানে নিজেদের প্রভাব বৃদ্ধি করতে গিয়ে পুরনো শত্র“ পাকিস্তানের সাথে কাশ্মির ছাড়াও সমস্যার নতুন ফ্রন্ট খুলেছে। চীনের সাথে তিব্বত ও অরুনাচল প্রদেশসহ সীমান্ত নিয়ে ভারতের বিরোধ অনেক আগের। প্রতিবেশীদের মধ্যে শুধু ভূটানের সাথে ভারতের সম্পর্ক স্থিতিশীল। এর প্রধান কারণ ভারতের সাথে ভূটানের সাক্ষর করা প্রতিরক্ষা চুক্তি। যে চুক্তির আওতায় ভূটানকে ভারত নিরাপত্তা ও বিদেশীদের ক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়ে থাকে। ১৯৪৯ সালে সাক্ষরিত ও ২০০৭ সাথে নবায়ন করা এই চুক্তির ফলে ভূটান মূলত ভারতের পকেটে ডুকে আছে। 

‘নেকলেস পলিসি’ দ্বারা চীন ভারত মহাসাগরে ভারতকে ঘিরে ফেলতে চায়। এই লক্ষ্যে চীন পাকিস্তান, শ্রীলংকা, মায়ানমার ও বাংলাদেশে গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণ ও সামরিক উপস্থিতি বাড়াতে সচেষ্ট। এছাড়াও চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড বা ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড’ প্রকল্পও ভারতের জন্য চিন্তার কারণ। চীনের চলমান এই দু’টি পলিসিকে মোকাবেলা করতে গিয়ে ভারতকে তার প্রতিবেশী দেশসমূহে আরও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। ফলে দেশগুলোতে ভারত বিরোধীতা যে নতুন মাত্রা পাবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। মজার ব্যাপার হলো ভারতের প্রতিবেশী সব রাষ্ট্রের জনগণ ভারতে চিকিৎসা সেবা পেতে ও  ভ্রমণ করতে পচ্ছন্দ করে কিন্তু দেশটিকে ঠিক সেই অর্থে পচ্ছন্দ করেনা। 

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ভারতের বর্তমান অবস্থা- কুল রাখি না শ্যাম রাখি। দেশটির পুরনো ও সময়ের পরিক্ষিত বন্ধু রাষ্ট্র রাশিয়া। স¤প্রতি সময়ে দেশটি রাশিয়াকে পাশকাটিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দিকে ঝুঁকেছে। স্টকহোমের ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক প্রতিবেদন মতে, ভারত বিশ্বের এক নম্বর অস্ত্র ক্রেতা দেশ। আর যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের এক নম্বর অস্ত্র বিক্রেতা দেশ। ফলে দেশ দুটির মধ্যে সুসম্পর্ক গড়ে ওঠাই স্বাভাবিক। এখানে ভারতের সমস্যা হলো- বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র যার বন্ধু তার আর শত্র“ দরকার হয় না। ভারত তা টের পেতে শুরু করেছে। রাশিয়ার কাছ থেকে এস-৪০০ ট্রায়াস্ফ বিমান প্রতিরোধ ব্যবস্থা কেনা কে কেন্দ্র করে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের পর ভারতের সাথেও বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে।   

এবছর ভারতের নির্বাচনের আগে ১৪ ফেব্র“য়ারি ভারতনিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পুলাওয়ামায় আত্মঘাতী হামলায় ভারতের আধাসামরিক বাহিনীর ৪০ জনের বেশী সদস্য নিহত হল। এর জবাব দিতে ভারত ১২ টি মিরেজ ২০০০ জেট বিমান নিয়ে পাকিস্তানের মাটিতে আকাশ পথে সার্জিকাল স্ট্রাইক চালালো। ফলাফল ভারতের বিমান ভূপাতিত, পাইলট অভিনন্দন আটক। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খাঁন পাইলট অভিনন্দনকে দ্রুত ভারতের কাছে হস্তান্তর করে তার রাজনৈতিক পরিপক্কতার প্রমাণ দিয়ে সারা বিশ্বের প্রশংসা পেয়েছেন। আর যে বিমানগুলো দিয়ে পাকিস্তান ভারতের এই অভিযান ব্যর্থ করে দিয়েছিল সেই এফ-১৬ বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের।

পাকিস্তানের কাছে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের এই বিমানগুলো সাথে চীনা বিমান বাহিনীর সাথে টক্কর দিতে ভারত ফ্রান্স থেকে রাফায়েল যুদ্ধবিমান ক্রয় করছে। পাকিস্তানে হামলার ঘটনার পর নরেন্দ্র মদি বলেছিলেন, রাফায়েল বিমান থাকলে ফলাফল ভিন্ন হতো। এখানে মনে রাখা ভালো, ১৯৪৭ সালে স্বাধীন হওয়ার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন ছিলো পাকিস্তানের বন্ধু রাষ্ট্র। রাশিয়ার সাথে ভারতের বন্ধুত্বও ঠিক তখন থেকেই। আর বর্তমানে ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্স ভারতের সব থেকে কাছের বন্ধু। রাশিয়ার বন্ধুত্বও ভারত একেবারে ছাড়তে চাচ্ছে না। ফলে আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্রসমুহেরও নিরেট বিশ্বাস অর্জন করা ভারতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সাথে রাশিয়ার সামরিক মহড়া এটাই প্রমাণ করে ভারতের প্রতি রাশিয়া আর শতভাগ আস্থা রাখতে পারছে না।    

রাফায়েল বিমান কেনা কে কেন্দ্র করে ভারতের রাজনীতিতে সরগরম কম হয়নি। এই বিমান কেনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি হয়েছে- এই অভিযোগে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধী মোদিকে দুর্নীতিবাজ, অনিল আম্বানির প্রধানমন্ত্রী,  গলি গলি মে শোর হ্যায়, চৌকিদার চোর হ্যায় বলে বলে নির্বচনী মাঠ গরম করে ফেলেছিল। কিন্তু তা হালে পানি পায়নি। দুর্নীতি কমাতে বিমুদ্রাকরণ করে ১০০০ রুপির নোট বাতিলের ঘটনায় জনদুর্ভোগ, গণেশ দেবতার মাথায় হাতির মাথা থাকা প্রাচীন ভারতে প্লাস্টিক সার্জারির প্রমাণ, খারাপ আবহাওয়ায় পাকিস্তানের রাডার ব্যবস্থা কাজ করবে না, এতে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সুবিধা হবে- এ ধরণের অবৈজ্ঞানিক ধারণা পোষণ জনমনে মোদি সম্পর্কে বিভ্রান্ত সৃষ্টি হলেও এবারের নির্বাচনে তার কোন প্রভাব পড়েনি। বরং ফল হয়েছে উল্টো। নরেন্দ্র দামোদরদাস মোদিকে ভারতের জনগণ দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নির্বাচিত করেছে।   
    
গুজরাটের সা¤প্রদায়িক দাঙ্গায় মোদির ভূমিকা সম্পর্কে সাধারণ মানুষের যে ধারণা তা তিনি কখনই বদলাতে পারবেন না। তার হাত ধরে ভারতে মৌলবাদী  ও সা¤প্রদায়িক রাজনীতির স্বর্ণযুগ শুরু হয়েছে। ভারতের দেখাদেখি মৌলবাদী রাজনীতির এই বিষবাস্প দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে-এই আশঙ্কা অনেকের। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান ইরানের ইসলামী বিপ্লবের মতো পাকিস্তানেও ইসলামী বিপ্লব ঘটানোর ইচ্ছা পোষণ করেছেন। বাংলাদেশের রাজনীতিতেও মৌলবাদী শক্তির উত্থান সময়ের প্রহর গুনছে। আফগানিস্তানে তালেবানরা আবার ক্ষমতার কেন্দ্রে চলে আসছে। যা ভারতের জন্য মোটেও সুখবর না। দেশের আপামর জনগণের, প্রতিবেশী রাষ্ট্রসমূহের ও আন্তর্জাতিক বন্ধু রাষ্ট্রসমূহের বিশ্বাস অর্জন দ্বিতীয় মেয়াদে মোদির সামনে বড় চ্যালেঞ্জ। 

কবিতা

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে আমি তোমাকে এঁকে ফেলি।   তোমার ছবি তখন আমার সাথে কথা কয়। তখন মায়াপুরিবেলা ভাসতে আর ভাসাতে নেই কোন মানা,   ...