দেশে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বচন দরজায় কড়া নাড়ছে। আগামী ডিসেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে নির্বাচন। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার বিষয়টি বিবেচনায় নিলে ২৮ জানুয়ারি ২০১৯ সালের মধ্যে অবশ্যই নির্বাচন করতে হবে। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশে এখন সবচেয়ে বড় আলোচ্য ইস্যু হলো- জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইভিএম মেশিনের মাধ্যমে ভোট গ্রহন। এই ইভিএম ইস্যু ভবিষতেও আমাদের পিছু ছাড়বে না, তা নিশ্চিত করে বলা যায়। আসলে কী এই ইভিএম মেশিন? আসুন জেনে নেয়া যাক-
মুক্ত বিশ্বকোষ উইকিপিডিয়ার তথ্য মতে, ইলেকট্রনিক ভোটিং আধুনিক বিশ্বে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ভোট প্রয়োগ বা সংশ্লিষ্ট ভোটারদের স্বীয় মতামত প্রতিফলনের অন্যতম মাধ্যম। ভোট প্রয়োগে মেশিন বা ইলেকট্রনিক যন্ত্রপাতি অণুসৃত হয় বিধায় সামগ্রিক প্রক্রিয়াটি ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম নামে পরিচিত। এর অন্য নাম ই-ভোটিং।
মূল কথা হলো আমরা দেশে ই- ভোটিং পদ্ধতি চালু করতে চাচ্ছি। এরমধ্যে নির্বাচন কমিশন দেড় লাখ ইভিএম মেশিন কেনার অনুমোদন দিয়েছে । বিয়ষটি প্রধান নির্বাচন কমিশনার ( সিইসি) কে এম নুরুল হুদা গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন। এর জন্য ব্যয় হবে ৩ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি থেকে এই ইভিএম কেনা হবে।
এখন প্রশ্ন হলো এই যে হাজার হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ইভিএম মেশিনগুলো কেনা হবে, এর কী কোন বিকল্প নেই আমাদের কাছে? অবশ্যই আছে। এর বিকল্প যে সম্ভাবনার দুয়ার আমাদের সামনে উন্মক্ত তাহলো-বৈশ্বিক মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন জিএসএমএ এর ‘মোবাইল ইকোনমি ২০১৭’ শীর্ষক প্রতিবেদন মতে, আমাদের দেশে একক বা ইউনিট মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা সাড়ে ৮ কোটি। বর্তমানে দেশে প্রতি চারজন মোবাইল ব্যবহারকারীর মধ্যে একজন স্মার্ট মোবাইল ব্যবহার করে। অর্থাৎ ২৫ শতাংশ মানুষ স্মার্ট মোবাইল ব্যবহার করে। ২০২০ সালের মধ্যে স্মার্ট মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬০ শতাংশে উন্নত হবে। তখন দেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৯ কোটি ৬০ লাখ। এদের ৬০ শতাংশ মানে প্রায় সাড়ে ৫ কোটি ম্মার্ট মোবাইল ব্যবহারকারী থাকবে ২০২০ সালে দেশে। আর এটা মোটামুটি নিশ্চিত স্মাটফোন ব্যবহারকারী মাত্রই ইন্টারনেট ব্যবহারকারী।
প্রযুক্তির এই যুগে বিশাল এই স্মাটফোন ব্যবহারকারীদের আমরা কাজে লাগাতে পারি। দেশের নির্বাচন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে আমরা সূচনা করতে পারি ই-ভোটিং যুগের।
আমার প্রস্তাব হলো: “নির্বাচন কমিশন একটা ই-ভোটিং মোবাইল অ্যাপ তৈরী করুক। যে অ্যাপ এর মাধ্যমে একজন বাংলাদেশী ভোটার পৃথিবীর যেকোন প্রান্ত থেকে নির্বাচনে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।” এই অ্যাপের নাম দিতে পারেন-‘আমতলা’।
যেভাবে তা কাজ করবে:
১. ভোটার: প্রক্রিয়াটিতে দেশে দু’রকম ভোটার থাকবে। প্রথমত ‘ট্রেডিশনাল ভোটার’ ও দ্বিতীয়ত ‘ই-ভোটার’। ট্রেডিশনাল ভোটার প্রচলিত ভোটপ্রদান পদ্ধতিতে ভোট দিবে। যারা মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভোট দিতে চাইবে, তারা ই-ভোটার হিসেবে বিবেচিত হবে। কেবলমাত্র একজন ভোটার নিজ উদ্যোগে ই-ভোটার হতে পারবে। তাকে কেউ জোর করবেনা। ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের সব ভোটারকে ই- ভোটারে পরিণত করার টার্গেট নিয়ে ইসি কাজ করবে।
২. নিবন্ধন বা সাইন-আপ: উক্ত ই-ভোটিং অ্যাপ একজন ভোটার তার মোবাইলে প্রথমে ডাউনলোড করবেন। এবং তাতে নিবন্ধন করবেন অর্থাৎ ফেসবুকের মতো তার সব ইনফরমেশন দিয়ে সাইন-আপ করবেন। এক্ষেত্রে তিনি তার ব্যক্তিগত ন্যাশনাল আইডি কার্ড, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইল আইডি ব্যবহার করে নিবন্ধিত হবেন। এবং নির্বাচন কমিশন অফিসে গিয়ে তিনি তার ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলিয়ে এসে নিবন্ধন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন। প্রবাসীরা বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোতে গিয়ে ফিঙ্গার প্রিন্ট মিলিয়ে আসবেন। এবং তিনি ‘ই-ভোটার’ হিসেবে নির্বাচন কমিশনে নিবন্ধিত হবেন।
৩. ভোট প্রদান: ই-ভোটার সবসময় অনলাইনেই ভোট দিবেন। তিনি কখনও স্বশরীরে কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিবেন না। এক্ষেত্রে একটা ভোট কেন্দ্রে ট্রেডিশনাল ভোটার ও ই-ভোটার দুই ধরণের ভোটার থাকবে। ট্রেডিশনাল ভোটারা স্বশরীরে কেন্দ্রে এসে ভোট দিবে আর ই-ভোটাররা অনলাইনে।
৪. ভোটের দিন ফ্রি ইন্টারনেট: ভোটপ্রদান সময়টুকুতে দেশে ফ্রি ইন্টারনেট সেবা চালু থাকবে। প্রত্যেক মোবাইল অপারেটর কোম্পানি তা প্রদান করবে। একজন ই-ভোটার তার নিবন্ধিত মোবাইলফোনে এই ফ্রি ইন্টারনেট সেবা পাবেন।
৫. লগইন: অ্যাপে দুই ধরনের লগইনের সুযোগ থাকবে। একটা ই- ভোটারের জন্য অপরটি ইসির জন্য। ইসি এই অ্যাপে শুধু ই-ব্যালেট পেপারসহ প্রয়োজনীয় সবকিছু আপলোড দিতে পারবে ও ফলাফল দেখতে পারবে ও প্রিন্ট দিতে পারবে। ইসি কোন কিছু ডিলিট করতে পারবে না।
৬. ই-ভোটারের ভোট প্রদান প্রক্রিয়াটি যেমন হবে-
ভোটের আগের দিন ইসি ই-ভোটারের নিবন্ধিত মোবাইলে এসএমএস ও ই-মেলের মাধ্যমে ই-ভোটারকে ভোটদানের সময় , তার কেন্দ্রের নাম ও কোড নম্বরসহ প্রয়োজনীয় সব ইনফরমেশন প্রদান করবেন।
ভোটের দিন প্রথমে ই-ভোটার তার ন্যাশনাল আইডি কার্ড নম্বর ও নিবন্ধিত মোবাইল নম্বর অথবা ই- মেইল আইডি ব্যবহার করে অ্যাপে লগইন করবেন। ফেসবুকে যেভাবে আমরা লগইন করি। এরপর লগইন নিশ্চিত ও ভোটপ্রদান প্রক্রিয়া শুরু করার জন্য অ্যাপ থেকে সংক্রিয়ভাবে একটি ভেরিফিকেশন কোড ই-ভোটারের নিবন্ধিত মোবাইল অথবা ই- মেইল ঠিকানায় আসবে। ভেরিফিকেশন কোডটিই হবে তার পরবর্তী পাসওয়ার্ড। কোডটি ব্যবহার করেই কেবলমাত্র ভোটদান প্রক্রিয়া শুরু করা যাবে। এতে করে একজনের ভোট অন্যজন কোনভাবেই দিতে পারবে না।
৭. ব্যালট পেপার: অ্যাপে ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে হুবুহু কাগজের ব্যালট পেপারের মতো ই-ব্যালট পেপারে ই-ভোটার ভোট দিতে পারবেন। একাধিক ব্যালট পেপার হলে একটার পর একটা ই-ব্যালট পেপারে ই-ভোটার ভোট দিবেন। এবং তা সংক্রিয়ভাবে গণনা হয়ে যাবে। ই-ব্যালেট পেপারে ভোট নষ্ট হবার কোন সুযোগ থাকবে না।
৮. ফলাফল ঘোষণা: ভোটের দিন ই-ভোটার নির্দিষ্ট সময়ে তার ভোটপ্রদান কার্য সম্পাদন করবেন। প্রবাসী ভোটাররা বাংলাদেশের লোকাল টাইম অনুসরন করে ভোট দিবেন। এই ব্যবস্থায় আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি প্রবাসীরাও দেশের সব নির্বাচনে তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন।
ভোট শেষে প্রতিটি কেন্দ্রের পেপারের ভোট আর ই-ভোট মিলায়ে ফল ঘোষনা করা হবে। নির্বচনী এজেন্ডের সামনে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী কর্মকর্তা অ্যাপ লগইন করে ই-ভোটের ফলাফল প্রিন্ট করে দেখাবেন ও ট্রেডিশনাল ভোট ও ই-ভোট যোগকরে চুড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করবেন।
৯.ভবিষ্যত: ২০২০ সালে যদি দেশের ৬০ শতাংশ মোবাইল ব্যবহারকারী স্মার্ট ফোন ব্যবহার করে এবং এধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪১ সালে দেশের শতভাগ মানুষের হাতে স্মার্ট ফোন থাকবে। রাজনৈতিক প্রতিশ্র“তি মতে তখন আমরা উন্নত দেশে পরিণত হব। আর তখন যদি আমরা আমাদের সকল ভোটারকে ই-ভোটারে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে ভোট গ্রহনের জন্য আমাদের বর্তমানের মতো সুচ-সুতা থেকে হাজার রকম জিনিস লাগবে না। তখন দেশে ভোট হবে অনলাইনে। ফলে ভোটের দিন হাজার হাজার ভোট কেন্দ্র থাকবে না তাই ভোট কেন্দ্র দখল ও জাল ভোট প্রদানের প্রশ্ন আসবে না। ভোটের সময় সেনা মোতায়নের মতো দাবি নিয়ে কাদা ছুড়াছুড়ির প্রয়োজন পড়বে না। সহায়ক সরকারও লাগবে না। নির্বাচনে নির্বাচনী এজেন্টসহ এতো মানুষ লাগবে না। নির্বাচনে এতো হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করতে হবে না। এমনকি নির্বাচনে বিদেশী পর্যবেক্ষকও লাগবে না।
ঐ সময় নির্বচন কমিশন ভোটের দিন নিরাপদ একটা হলরুমে লাইভ ভোট প্রদান কার্যক্রম দেখানোর ব্যবস্থা করবেন। জাতীয় নির্বাচনে ইসির প্রধান কার্যালয়ে ৩০০টি আসনের জন্য ৩০০টি বড় মনিটরে ভোটগ্রহণ কার্যক্রম লাইভ দেখাবেন। যেখানে নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সকল দলের প্রধানগণ কোন রকম যোগাযোগ ডিভাইস ছাড়া উপস্থিত থেকে লাইভ ভোটগ্রহণ দেখবেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একটা নির্বাচনী আসনের জন্য একটা। আর স্থানীয় সরকার নির্বচনের সময় উপজেলা নির্বাচন অফিসে লাইভ ভোটগ্রহণ কার্যক্রম দেখানোর ব্যবস্থা করবেন। যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন অর্থাৎ প্রার্থীগণই শুধু উক্ত হলরুমে কোন রকমের যোগাযোগ ডিভাইস ছাড়া নির্বাচনে দায়িত্বপ্রপ্ত অফিসারদের সাথে অবস্থান করে লাইভ ভোট প্রদান কার্যক্রম দেখবেন। এক্ষেত্রে ভোটারের ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের শেষের তিনটি ডিজিট গোপন রেখে দেখানো হবে তিনি কোন প্রতীকে ভোট দিয়েছেন। যেমন আমরা ফেসবুকে একটা ছবি শেয়ার করলে দেখতে পাই কে কে তাতে লাইক দিচ্ছে। এক্ষেত্রেও বিষয়টি সে রকম হবে। নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতীকগুলো পরপর থাকবে এবং প্রাপ্ত ভোট প্রতীকের নিচে উঠতে থাকবে ও অটো গণনা হতে থাকবে। ভোটদানের সময় শেষ হওয়া মাত্রই রিটারনিং কর্মকর্তা ফল ঘোষণা করবেন।
হলরুমে বসে প্রার্থী লাইভ দেখতে পারবে তাকে কে কে ভোট দিচ্ছে। ছবি ও জাতীয় পরিচয় পত্রের তিন ডিজিট গোপন রাখার ফলে প্রার্থী ভোটারকে চিনতে পারবেন ঠিকই তবে বাকী ১৪ ডিজিট দেখে আসল ভোটের নিশ্চয়তা তিনি নিশ্চিত হতে পারবেন। ভোট শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোন প্রার্থী বা দলীয় প্রধানগণ হল রুম থেকে বের হতে পারবেন না। বাইরে থেকেও কেউ হলরুমে প্রবেশ করতে পারবে না।
প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে সবসময় ভিন্নমত থাকবেই। এটাই নিয়ম। মানুষ পুরাতনকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে চায়। তবে এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বড় যে সমস্যাটা হবে তা হলো হ্যাকিং। আমার কথা হলো অ্যাপেল কোম্পানি যদি হ্যাকিংমুক্ত সফটওয়্যার তৈরী করতে পারে তাহলে জাতি হিসেবে আমরাও তা পারবো।
এই ব্যবস্থায় দেশ ও দেশের বাইরের সকল প্রবাসী ভোটারকে ভোটদানের সুয়োগ করে দেওয়া যাবে। আমাদের সংবিধান যেহেতু দ্বৈত নাগরিকত্ব বিষয়টি স্বীকার করে। তাই এই ব্যবস্থায় সংবিধানিক অঙ্গকারও পূরণ করা সম্ভব হবে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভোট প্রদানের সুবিধা চালু হলে বাংলাদেশী সব নাগরিক কোন ঝামেলা ছাড়াই ভোট দিতে পারবো। ২০২০ সালের মধ্যে সাড়ে ৫ কোটি ভোটারকে যদি আমরা ই-ভোটারে রূপান্তরিত করতে পারি তাহলে আমাদের নির্বচন খরচ বর্তমানের অর্ধেকে নামিয়ে আনা যাবে। আর মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে ভোট গ্রহণের ই-ভোটিং প্রদ্ধতি আমরা যদি সফলভাবে চালু করতে পারি তাহলে তা পৃথিবীর বুকে অনন্য নজির স্থাপিত হবে। এটা হতে পারে ভোটগ্রহণে পৃথিবীর বুকে বাংলাদেশ মডেল। বর্তমানের মানি না মানব না সংস্কৃতি থেকেও আমরা মুক্তি পাব। নীতিনির্ধারক ও প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিরা বিষয়টি ভেবে দেখবেন কী?
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন