শুক্রবার, ৩১ মে, ২০১৯

কুপ্রবৃত্তি

থালাভরা খই হাতে নিয়ে, খিলখিলিয়ে হাঁসে বালিকা
থামার কোন লক্ষণ নেই।
থমকে দাঁড়ায় পথিক এক
থামিয়ে সকল মতিগতি।
থরহরি হৃদয়ের কম্পন নিয়ে, অপলক চায় সে
থমথমে ভাব অনুভব করে নিজের মাঝে।
থালাভরা খই হাতে নিয়ে, খিলখিলিয়ে হাঁসে বালিকা
থামার কোন লক্ষণ নেই।
থতমত খায় নিজেই নিজের হটকারিতায়
থামের মতো দাঁড়িয়ে পড়লো, কেন সে?
থলকমল দেখে, কেনইবা দাঁড়াবে না সে!
থিতানো আদিম প্রবৃত্তি প্রমোদ দেয়
থাম্বা কেন, খোলা তলোয়ার হয়ে গর্জন দেবে সে,
থমকে দাঁড়ানোতে তার কী দোষ?
থেমে যাওয়া অতীত প্রবাহমান তার ধমনীতে
থানাপুলিশ ভয় পায় না সে।
থমিয়ে সকল ধর্মাবতার,নিজেকে প্রমাণ করার নেশা জাগে
থামিয়ে হাঁসি,তাকায় না কেন বালিকা?
থালাভরা খই হাতে নিয়ে, খিলখিলিয়ে হাঁসে বালিকা
থামার কোন লক্ষণ নেই।
থির না পৃথিবী, স্থির শুধু কুপ্রবৃত্তি
থরেথরে সাজানো মানতার গান,
থোড় মনে হয়, থুকথুকে চাওয়ার কাছে।

বিচ্যুতি

তব
তাই হোক
তুমি আমি মিলে
তেমত খেলি ভানুমতীর খেল।
তলতলে বিছানায় নিজেকে বিকিয়ে
তাপক চকচকে টাকার ঘ্রাণ নয়,
তুমি আমি ভাসি ভালোবাসায়।
তমসাচ্ছন্ন নয়-খোলা আকাশের নীচে
তরতিব ব্যাকরণ পাঠ করে করে,
তবহিঁ শুদ্ধ হই।
তাবৎ তাপসীদের দেখিয়ে দিই
তথাগত মহাপ্রাণ আমরাও হতে পারি।
তোমার উদ্যত বক্ষ, মুক্তবেণী আর মুখচ্ছটা
তঞ্চকদের জিবে জল আনতে পারে,
তন্ত্রধারকের চেয়ে, এ কথা আমি প্রবলভাবে বিশ্বাস করি।
তির্যকযোনি আর যোনিপথের পার্থক্য বোঝে না মূর্খ
তিল আর তাল সমান তিরিক্ষি কপটের কাছে,
তাজিম তার তাবিজে বন্দী।
তমসাবৃত পৃথিবীতে তোমার আমার বিচ্যুতি
তরণী ভরে তরুণিমা আর ভালোবাসা নিয়ে আসুক।

এই সময়

শহুরে চাঁদ গিলে খায় উড়ন্ত সাপ
শূন্য দেখায় তার কোটিপতি বাপ।
শাঁসহীন আমের কাছে মার খায়
শতবান শয়তান।
শ্যামচাঁদ হাতে শাকরেদ
শপথ নেয় বানাবে শ্মশান।
শরিকান শেখে শরিয়তের পাঠ
শতরঞ্জ খেলায় মত্ত ষন্ড
শেখায় শরীরতত্বের সংবিধান।
শূন্যগর্ভ দেয় সিংহের হাঁক
শাস্ত্রজ্ঞ করে শিক্ষার মন্ডুপাত।
শুভ্রাংশু হেরে যায় মোমআলোর কাছে
শুঁটকি করে স্থুলোতার বড়াই,
শ্ববৃত্তি যেখানে শেষ কথা
ষড়ঙ্গের ষষ্ঠীপূজা সেখানে শঠতা।

ভূতের গল্প

অনেক কিছু দিতে চাই না
শুধু অনেক ভাবনা আছে।
যেকেউ ভূত দেখতে পারে
ভূতেরা হায়ানা ।
শুধু চোখ থাকা চায়
মালাশার মতো সুন্দর না হলেও
যেকোন ধরনের চোখ।
খুব কষ্ট
কে বোঝে, কী বোঝে?
সন্ধা দেখতে মন চাই
জীবন থেকে সন্ধাতারারা হারিয়েগেছে,
এটা সত্যি।
সিনেমা দেখে সময় কাঁটায়
ভূতের গল্প খোলা হয়েছে,
দুটো গর্ত আর দুটোতেই ভয়
সিনেমার সব গল্পাই ভূতের গল্প।

আশা

যেহেতু আমি জানি
আমি সেই, এই আমি
যে তোমাকে চালনা করতে চাই না।
স্বাধীন জীবন ভালোবাসি
মাথাব্যাথা নেই
তোমাকে নিয়েও না ।
আমার ভ্রমন ধরো
আমার সারা জীবন।
আমার বিচার করো, যতটা তুমি চাও
শুধু আমাকে দেখাও তুমি পারফেক্ট।
আমার নেই তুমি কিন্তু তুমি শুধু আমার
তোমার চোখ সুন্দর।
পরিস্কার না হলে নিশ্চিত নয়
যদি তা পরিস্কার না হয়।
তোমার ঐ সুন্দর চোখ
আমার নামকে প্রতিনিধিত্ব করে।
তোমার নামে যোগাযোগ করা হবে
খেয়াল রেখো এবং আশা।

ভালোবাসা

আমি অনেককিছু নিয়েই বেঁচে আছি
কে ভালো ব্যাখ্যা করতে পারে?
আমি ব্যাখ্যা পচ্ছন্দ করি।
কোন কিছুতেই যাই আসেনা আর
মৃত্যুর মিছিলও টলাতে পারে না আমাকে।
মরেগেলে মানুষ ইতিহাস হয়ে যায়
আমি ইতিহাস রচনা করবো
এই ভাবনা আর ঘুম
ঘুম আর ঘুমের মধ্যে তুমি
এই নিয়েই আমার জগৎ।
জানি না প্রেম কি হবে!
আমি তোমার কাছে থাকতে ভালোবাসি
আমি আর তুমিই ভালোবাসা, ভালোবাসা।

মালাশার ইচ্ছা

সুনয়না মালাশা
মনে তার দারুন আশা
প্রেমিকের সাথে বাঁধবে বাসা।
তাকে নিয়ে থাকবে ঘরে
ঘুরবে সে পঙ্খিরাজে চড়ে।
চলে যাবে দূও দেশে
স্বপ্নের ভেলায় ভেসে।

আমার কবি বন্ধুটির কাছে তার হৈমবতীকে ধার চেয়েছিলাম। পাইনি। নিজে ভুলেই গিয়েছিলাম আমারও একজন হৈমবতী ছিল! আসলে আছে। ওর নাম মালাশা । ওর সুগভীর চোখে একদিন ডুবে গিয়েছিলাম। এরপর আর কেউ আমাকে টেনে তুলিনি। আমি নিজেও ভুলেই গিয়েছিলাম, আমি মারা গিয়েছি! যাহোক কবি তোমাকে ধন্যবাদ মালাশার কাছে আমাকে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য। তবে বলে রাখি তোমার হৈমবতীর প্রতি কেমন যেন একটা দূর্বলতা অনুভব করি।

সময়

গতকাল,আজ ও আগামীকাল
নাকি একই সময়?
এসব পদার্থবিদ্যার আমি কিছু বুঝিনা,
আমি শুধু তোমাকে বুঝি ।
তোমার দিকে তাকিয়ে নিজেকে ভুলে যায়,
সময়হীন অনন্ত সমীরণে ভেসে যায়।
আচ্ছা,তুমি কেমন আছো?
তুমি কী কৃষ্ণগহ্বর ?
আমি কী তোমাতে বিলিন হবো !
তুমি আর চুরি বড় বেশী সুস্বাদু
বাতাসে শুধু তোমারই গন্ধ।
আমি কী তোমার মন চুরি করতে পেরেছি?
মন চুরি কী একটা অপরাধ?
না বোধ হয়।
আমার পাওনা সবার আগে বুঝে নিয়েছি
এতে অপরাধ কী?
তুমি কী স্বুস্থ্য?
নাকি কী পান খাও ।
আমি দাঁড়িয়ে আছি নদীটির ধারে
সময় পেলে এসো।
সময় নিয়ে গল্প করা যাবে,
সময়হীন সময়ের গল্প!

অসংলগ্ন কবিতা

কবিরাজ তোমাকে ভীষন মনে পড়ছে আজ!
জাহাজ ভাঙ্গা আর জাহাজ বানানো এক কথা না।
কিভাবে পরে বাতাস খাওয়া যায়?
রোগীর অভাব আছে।
যখন চলে যাচ্ছি, তখন
আফসোস বলো না।
কারন তখন আমি সীমা থেকে বহু দূরে।
শুধু আমার দিকে তাকাও
আমি ফিরে যেতে পারবো না।


Tiger sir, হলুদ সংবাদিকতা ও শিক্ষা ব্যবস্থার মান নিয়ে Facebook-ইয় ঝড় !!!!

১৯০৬ সাল ! এতগুলো বছর আগে প্রতিষ্ঠিত আমার প্রাণের স্কুল নাটুদা মাধ্যমিক বিদ্যালয় । আমার জানামতে চুয়াডাঙ্গা জেলায় আর মাত্র একটা স্কুল আছে যেটার বয়স এরচেয়ে বেশি ।৫ম শ্রেণী পাশ করার পর আমি এই স্কুলে ভতি' হবার পর মজার যে ব্যাপারটা ঘটে তা হলো আমি কয়েক জন শিক্ষককে পাই যারা আমার মা ও বাবার শিক্ষক যেহেতু তারাও এই স্কুলের ছাত্র ছিল ।অতএব হাই স্কুলে ভতি' হবার পর স্কুলের সিনিয়র শিক্ষকদের সামনে আমার অবস্থা দাঁড়ালো - তোর বাবা-মা কে পিটায়ে মানুষ করেছি আর তুইতো তাদের বাচ্চা !

এদের মধ্যে একজন শিক্ষক ছিলেন যাকে আমরা tiger sir নামে জানতাম ও আড়ালে ডাকতাম।শুধু আমরা না এলাকার সকলে ওনাকে এ নামেই চেনে । Tiger sir নামের আড়ালে ওনার আসল নাম কবে কখন কোথায় হারিয়ে গেছে তা কেউ বলতে পারে না । নাম থেকে নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে ওনাকে দেখে আমরা কতটা ভয় পেতাম ।
সৌভাগ্যক্রমে উনি ছিলেন আমার বাবা-মার ও শিক্ষক ! 

স্যার একটা ফনিক্স সাইকেলে চড়ে রোজ স্কুলে আসতেন এবং উনি স্কুলে প্রবেশের পরপর ই স্কুলের soundtrack যে পথে চলত তাহলো - নীরবতা ও নো দুষ্টমি । স্যারের সাইকেলটা ছিল আমার খুব প্রিয় , আমি প্রায় এ রকম একটা সাইকেল কেনার স্বপ্ন দেখতাম এমনকি এখনও দেখি । ওনার সাইকেলের সাদা কেরিয়ারটা আমি অনেকবার ছুঁয়ে দেখেছি লুকায়ে লুকায়ে । স্কুলে ওনার প্রতি আমার ভয় ও আগ্রহের সীমা ছিলনা । এ ছিল অনুভূতির এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন, জীবনের সবচেয়ে সূক্ষ অনুভূতিগুলোর একটি ।


শ্রেণীকক্ষে স্যারকে আমরা প্রথম পায় ৮ম শ্রেণীতে । উনি আমাদের ইংরেজি পড়াতে আসলেন, আমরাতো সকলে ভয়ে অস্থির কি না কি হয় ! উনি প্রথমেই পিছন থেকে একজনকে দাঁড় করালেন ও জিজ্ঞাসা করলেন - বলতো, আমার একটা গরু আছে , এর ইংরেজি কি ? আমার বন্ধুটি ভয়ে ভয়ে বললো - sir I am a cow . আমরাতো সকলে চুপ , পিনপন নীরবতা এখন কী না কী হয় ! মার শুরু হবে নিশ্চয় । স্যারের পেটানোর ইতিহাস আমি আব্বার কাছথেকে অনেকবার শুনেছি । আমি অবাক হয়ে শুনলাম - তুই দাঁড়িয়ে থাক । শুনলাম ! কেননা আমি বই-খাতার উপর মুখগুজে বসেছিলাম এবং হঠাৎ আমার বম কানে জোরে টান অনুভব করলাম । আমাকে কানধরে দাঁড় করাতে করাতে স্নহমিস্রত কন্ঠে স্যার বললেন , এই আবেদ এর বাচ্চা, তুই বল । যথাযথ বলার পরই স্যার আমার কান ছাড়লেন । এভাবেই শুরু হলো স্যার এর সাথে আমাদের ইংরেজি পাঠ ।

পরবর্তীতে স্যার ক্লাসে এসে প্রথমেই কান ধরে আমাকে দাঁড় করাতেন ও পড়া জিজ্ঞাসা করতেন , না পারলে ক্লাসের বাকী সময় কান ধরে দাঁড়িয়ে থাকা অবধারিত । খুব রাগ হতো তখন, কেন প্রথমেই আমাকে পড়া ধরতে হবে কিন্তু এখন বিষটি যতবার মনে পড়ে স্যারকে মনে মনে ধন্যবাদ দেয় কারন কারনটা উপলব্ধি করতে পারি এখন । স্যার আমাদের পড়া দিতেন ও ক্লাসে তা আদায় করে নিতেন । আমার স্পষ্ট মনে আছে , verb এর present-past-past participle ও Degree ইর ক্ষেত্রে positive-comparative-superlative , form বলার ক্ষেত্রে - আমরা ভয়ে কত কিই না বলেছি আর কান ধরে দাঁড়িয়ে থেকেছি । যেমন, good-gooder-goodest. তবে আমরা যতটা জানতাম স্যার সম্পর্কে ততোটা ভয়ংকর উনি আমাদের সাথে কখনই হননি কিন্তু ওনাকে আমরা প্রচন্ড ভয় পেতাম; পরে university-তে পড়ার সময় জেনেছি , ভয় চিত্তকে শুন্য করে দেয় !

এখন আসা যাক, সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝড় ওঠ GPA 5.00 পাওয়া শিক্ষাত্রীদের মান নিয়ে । এক্ষেত্রে একটি বেসরকারি টেলিভিশন এর একজন হলুদ সংবাদিক তার ইচ্ছামত কয়েকজন কমলমতি শিক্ষাত্রীর সাক্ষাত কার নিয়ে আমাদের বুঝাতে চেয়েছে এরা কিছু জানেনা শুধুশুধু GPA 5.00 পেয়েছে আর আমাদের দেশের শিক্ষার মান শেষ ।
বিষটি এরকমই ,না উদ্দেশ্য প্রণদিত ?
যদি উধারণ দিয়ে বলি , আমার নিজের ছোট ভাই GPA 5.00 পাওয়া কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এর খ ইউনিট এর admission test- এ ও বাংলায় ফেল তাই যথারীতি চান্স পায়নি । একই বিষয় ছোট বোনটার ক্ষেত্রেও তবে ও ইংরেজীতে ফেল । তাহলে কী দাঁড়ালো ,তাদের মান যাচ্ছেতায় ।
কিন্তু বিষটি কি এরকম ?

বাস্তবে, আমার ভাইটা জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয় আর বোনটা জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এ পড়ে ।
আসলে প্রায় প্রতিটি বিষয়কে দুই ভাবে বলা যেতে পারে ভাল অথবা মন্দ । এক্ষেত্রে মন্দ ভাবে বিষয়টি আমাদের দেখানো হয়েছে । কমোলমতি কয়েকজন শিশু tv boomer সামনে ভীতিকর অবস্থায় পড়ে ভুলভাল উত্তর দিয়েছে আর তা আমাদের খাওনোর চেষ্ঠা করা হচ্ছে ।

আজ সকালের একটা অভিজ্ঞতা বলে শেষ করি । প্রচন্ড ব্যস্তার মধ্যে কাজ করতে থাকা আমার এক বন্ধু কে আমি হঠাৎ ফোন করে জিজ্ঞাসা করলাম , বলতো আইনস্টাইন কে ছিলেন ? সে প্রথমে যা বললো তা শুনেতো আমি হতবাক আর তা হলো - উনি একজন সাহিত্যিক । আমি ওকে জিজ্ঞাসা করলাম তোর এরকম মনে হলো কেন ? ও ওর ভুল বুঝতে পেরে পরক্ষনেই বললো - আরে না না , উনি একজন বিজ্ঞানি ,আসলে রবীন্দ্রনাথ এর সাথে ওনার সাক্ষাত এর কথা হঠাৎ মনে আসাতেই -
আসলেই কী তাই !! ? বলাতে ও বললো এখন ফোন রাখতো পরে কথা বলবো , বলেই ও ফোন রেখে দিলো !!!!!!!!!!!!!

প্রযুক্তি দুনিয়ায় শীতল যুদ্ধ শুরু

যুদ্ধ শব্দটা শুনলেই আমাদের মনের ভেতর এক ধরনের অজানা আশঙ্কা কাজ করে। ভয় আর ভয়াবহতার চিত্র মনের কোণে উুঁকি ঝুঁকি দেয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে এরকম ভয়াবহ নির্মম কিছু ছবি ভাইরাল হয় মাঝে মধ্যে। বিশ্ব বিবেক কেঁপে ওঠে কিন্তু নড়ে ওঠে বলে মনে হয় না। পৃথিবী জুড়ে স্বার্থ আর নিরাপত্তার নামে চলা যুদ্ধে-মানুষ নিধন চলছেই। প্রত্যক্ষ এসব যুদ্ধের আড়ালে আবার জোড়সোড়ে শুরু হতে যাচ্ছে নতুন এক শীতল যুদ্ধ।

শীতল যুদ্ধ বা স্নায়ুযুদ্ধ হল, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পঞ্চাশের দশক থেকে আশির দশকের শেষ দিক পর্যন্ত সময়টিতে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে কমিউনিজম আর যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের নেতৃত্বে ক্যাপিটালিজমের মধ্যে চলা এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ। যা ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়। কিন্তু বাস্তবে তা রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের সজ্ঞার মতো, ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ অবস্থায় বর্তমান পৃথিবীতে বিরাজ করছে। এই শীতল যুদ্ধে পৃথক পৃথক দুটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার মধ্যে রেষারেষি ও প্রতিযোগিতা বিশ্বকে দুইটি পৃথক ব্লকে ভাগ করে ফেলেছিল।  আর স¤প্রতি আমরা যুক্তরাষ্ট্র আর চীনের মধ্যে নতুন ধরনের শীতল যুদ্ধের আভাস পাচ্ছি।

মজার ব্যপার হল, পৃথিবীর একমাত্র দেশ চীন এই দুটি মতবাদ কমিউনিজম ও  ক্যাপিটালিজমকে তার মতো করে আপন করে নিয়েছে। রাজনৈতিক দিক দিয়ে দেশটি কমিউনিজমের উৎকৃষ্ট উদাহরণ আবার অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সে ক্যাপিটালিজমের বড় উদাহরণ। এক্ষেত্রে চীন অতি নিকট ভবিষ্যতে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠ হতে যাচ্ছে। এখানেই যত সমস্যার মূল। ক্যাপিটালিজমের বর্তমান মোড়ল যুক্তরাষ্ট্র চীনের এই উৎথানকে কোন ভাবেই মেনে নিতে পারছে না। আবার ঠেকিয়েও রাখতে পারছে না। আমেরিকার অবস্থা হলো-শ্যাম রাখি না কুল রাখি, পর্যায়ের। কারণ চীনের সাথে ঝামেলায় তারও অবশ্যই অনেক ক্ষতি হবে। আবার বিষয়টিকে সে-ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি, বলে উপেক্ষাও করতে পারছে না।  

২০১৩ সাল থেকে চীন তার ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড’ প্রকল্প নিয়ে এগুচ্ছে। এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপের ৬০টি দেশকে যুক্ত করে চীন তার চারপাশ ঘিরে স্থল ও জল পথে নতুন এক বাণিজ্য পথ খুলতে সচেষ্ট। ইতিহাসের রঙের প্রলেপ দিয়ে এক বলা হচ্ছে ‘সিল্করুট’। প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং এই ‘ওয়ান বেল্ট-ওয়ান রোড’ কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে চীনকে বিশ্ব বাণিজ্যের চালকের আসনে বসাতে তৎপর। নতুন এই সিল্করুটের সাথে সংশিষ্ট দেশগুলোকে চীন অবকাঠামো উন্নয়নসহ নানান খাতে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার  ঋণ দিচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চীনের এই ঋণ আদতে একটি ফাঁদ, ভূরাজনৈতিক স্বার্থ হাসিল করতে চীন তা ব্যবহার করবে। চীনের ঋণ যে ঋণফাঁদ তার বড় উদাহরণ হল, শ্রীলঙ্কার দক্ষিণের হামবানতোতায় নির্মিত গভীর সমুদ্র বন্দর। চীনা ঋণে নির্মিত এই বন্দরটি শ্রীলঙ্কা চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না মার্চেন্টস হোল্ডিংসের কাছে ৯৯ বছরের জন্য ইজারা দিতে বাধ্য হয়েছে, চীনা কিস্তির টাকা শোধ দিতে না পেরে। চীনা ঋণে জর্জরিত দেশগুলি স্বাভাবিক নিয়মেই আমেরিকার পকেট থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে এবং  যুক্তরাষ্ট্র তা কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এতা গেল বাস্তব দুনিয়া। প্রযুক্তি দুনিয়ায়ও যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে শেষ হতে চলেছে।  

ফলশ্র“তিতে, স¤প্রতি সময়ের সব আমেরিকান প্রেসিডেন্ট চীনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছেন। সারা বিশ্বে চীনের একক বাণিজ্য আধিপত্য রুখতে তারা কার্যকরি পদক্ষেপ নেবেন, নির্বচনের সময় এই প্রতিশ্র“তি ও যুদ্ধের ঘোষণা দিতে দেখা যায় সব আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের। মজার ঘটনা হল, সাধারণত নির্বচনী প্রচারণার সময় যেসব নির্বাচনী ক্যাপ মাথায় দিয়ে আমেরিকান প্রেসিডেন্ট প্রার্থীরা চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের ঘোষণা দেন-সেই ক্যাপটিও সাধারণত হয় চীনের তৈরী। অর্থৎ বিষয়টা দাঁড়ায় পা থেকে মাথা পর্যন্ত চীনা পণ্য পরিধান করে, চীনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা।  
  
এরই ধারাবাহিকতায় গত বারের নির্বাচনেও বর্তমান আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীনের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধ ঘোষণার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন।  এবং তিনি তার কথা রেখে-তা শুরু করেছেন। স¤প্রতি চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়েকে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে এনটিটি লিস্টে ঢুকিয়েছেন ও কালো তালিকাভুক্ত করেছেন। ফলে এখন থেকে মার্কিন কোম্পানিগুলোকে প্রতিষ্ঠানটিকে যন্ত্রাংশ বিক্রি করতে সরকারের অনুমতি নিতে হবে। গুগল ইতমধ্যে হুয়াওয়েকে তার প্রযুক্তির সেবা ও সুবিধা দিতে অস্বকৃতি জানিয়েছে। 

এই সমস্যর শুরু যেখানে। ২০১৪ সালে! সেমিকন্ডাক্টর চিপ খাতে ১৫০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের ঘোষণা দেয় চীন। এবং ২০১৫ সাথে ‘মেড ইন চাইনা টুয়েন্টি টুয়েন্টি ফাইভ’ নামে একটি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা পেশ করে দেশটি। প্রযুক্তি খাতে চীনের এই উন্নত প্রযুক্তি শিল্প তৈরীর লক্ষ্যকে শুরুতে আটকে দেওয়ার সিন্ধান্ত নেয় তৎকালীন ওবামা প্রশাসন। চীনের বাজারে মার্কিন প্রযুক্তি জায়েন্ট ইনটেলকে পণ্য বিক্রিতে বাধা দেওয়া হয়। চীনা প্রতিষ্ঠান যাতে সহজে কোন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানকে অধিগ্রহণ করতে না পারে সাথেসাথে এই ব্যবস্থাও করে  মার্কিন প্রশাসন। স¤প্রতি ওবামা প্রশাসনের গৃহীত ব্যবস্থাকে আরও শক্তপোক্ত করলো ট্রাম্প প্রশাসন।  

ইকোনমিস্টের এক প্রতিবেদন মতে, মূলত মাইক্রোচিপের বাজার দখল নিয়েই এই লড়াই। চিপ তৈরীতে এত দিন শুধু মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলো একচ্ছত্র আধিপত্য দেখিয়েছে। এর বড় উদাহরণ-ইনটেল। কিন্তু এখন চিপের রাজ্যে চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো হানা দিচ্ছে। প্রযুক্তি দুনিয়ায় শুরু হয়ে গেছে ‘চিপযুদ্ধ’। চিপযুদ্ধ শুরু হওয়ায় চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টা শুরু করেছে। আলিবাবা,বাইদু ও হুয়াওয়ে চিপ তৈরীতে ঝাঁপিয়ে পড়েছে। 
হুয়াওয়ে কে জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি বলে আসছেন ট্রাম্প। গত বছর হুয়াওয়ের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ আনে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রে ফাইভজি সেবার কাজে হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে দেশটি। নিরাপত্তা ঝুঁকির কথা বলে হুয়াওয়ের ফাইভজি প্রযুক্তি ব্যবহার না করতে অনেক দেশকে চাপ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। যদিও হুয়াওয়ের আগে আর এক চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান জেডটিই এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ছিল ও আছে। 

বিষয়টা অনেকটা ট্রান্সফরমারস: ডার্ক অব দ্য মুন সিনেমার ঐ দৃশ্যটির মতো।  জেরির টেবিলে থাকা কম্পিউটার হঠাৎ একটা রোবট পাখি হয়ে বলল, জেরি ইউ আর মাই ফেবারিট, তুই উইকি উইকিকে কী বলেছিস? যুক্তরাষ্ট্রের সন্দেহটাও ঠিক এরকম। তারা ভাবছে টেলিযোগাযোগ খাতে ব্যবহৃত চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর সরবরাহকৃত পণ্যে ও প্রযুক্তির মাধ্যমে চীনা সরকার সে দেশে গুপ্তচরবৃত্তি করছে ও গুরুত্বপূর্ণসব তথ্য হাতিয়ে নিচ্ছে। ট্রাম্পের মতে, হুয়াওয়ে খুব বিপদজনক। নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ ও সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে তাদের বিপদের মাত্রা বোঝা যায়।

হুয়াওয়ের প্রতিষ্ঠাতা রেন ঝেংফেই যদিও বলেছেন মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় তার প্রতিষ্ঠানের কিছু আসে যায় না। তিনি বলেন, বিশ্ব হুয়াওয়ে ছাড়া চলতে পারবে না। কেননা, আমাদের প্রযুক্তি অন্য সবার চেয়ে উন্নত। এরই মধ্যে হুয়াওয়ে তার নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘হংমেং’ ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছে। আর চীনারা তো অনেক দিন থেকেই তাদের নিজস্ব ধরণের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ব্যবহার করছে। 

যুক্তরাষ্ট্র-চীন চলমান বাণিজ্যযুদ্ধ নিয়ে চীনের বাণিজ্যমন্ত্রী জং শান-এর বক্তব্য প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোন ধরনের বাণিজ্য যুদ্ধ বিশ্ব অর্থনীতির জন্য কেবল দুর্যোগই ডেকে আনবে। এ যুদ্ধে কেউ জয়ী হবে না। এর ফলে চীন-যুক্তরাষ্ট্র শুধু নয়, সারা বিশ্বই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ঠিক তাই, ক্ষতি সবারই হবে। 

আমেরিকানদের কাছে ট্রাম্পের যে প্রতিশ্র“তি- মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন, তা তিনি বাস্তবায়ন করতে চান। প্রশ্ন হল, তা কিভাবে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, তিনি মেড ইন আমেরিকার ওপর বেশি জোর দিচ্ছেন। প্রেসিডেন্ট ট্্রাম্প তার দেশের সব কোম্পানিকে আমেরিকায় কারখানা স্থাপন ও বিদেশে অবস্থিত তাদের কারখানাগুলোকে দেশে ফিরিয়ে আনার কথা বলছেন। যা অর্থনৈতিক বাস্তবতায় অসম্ভব। অনেকে মজা করে বলেন এই ক্ষাপাটে প্রেসিডেন্ট আমেরিকাকে গ্রেট করতে গিয়ে গভীর সমুদ্রে ডুবাবে। আর চীনের সাথে তার বাধানো বাণিজ্যযুদ্ধ শীতল যুদ্ধে রূপ নিয়ে বিশ্বের প্রতিটি মানুষকে দুইভাগে ভাগ করে ফেলবে। নিকট ভবিষ্যতে আমাদের হয়তো মেড ইন চাইনা অথবা মোডে আমেরিকা এর যে কোন একটিকে বেছে নিতে হবে। 



এবার ইরান?

পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সাথে শিগগিরিই যোগ দিবে অপর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আলিংটন। ইউএসএস আলিংটন উভচর যান ও যুদ্ধবিমান পরিবহনে সক্ষম। অপর রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন প্যাট্রিয়ট আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনায় সজ্জিত। সাথে আরও খবর হলো, এরই মধ্যে কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়ন করা হয়েছে। এসব কিসের আলামত? তাহলে কী মধ্যপ্রাচ্যে আরও একটা ভয়ংকর যুদ্ধ আসন্ন?

এর সম্ভাব্য উত্তর হলো, হতেও পারে আবার নাও হতে পারে। একটা যুদ্ধ শুরু হবার ঠিক আগে আমরা যা দেখি তাহলো, উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়, মিথ্যাচার, সমর প্রস্তুতি আর ভিতর ভিতর কলকাঠি নাড়ে একদল।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এখন চলছে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়। এই বাক্য বিনিময়ের সূচনা ছয় জাতির পারমাণবিক চুক্তি থেকে ইরানের আংশিক বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে। যা প্রায় দুই বছর আলোচনার পর ২০১৫ সালের ১৪ জুলাই অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স,রাশিয়া,চীন ও জার্মানির সঙ্গে ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত হয়। এখন ইরান বলছে, চুক্তি থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে না গেলেও চুক্তির কিছু শর্ত আর এখন তারা মানবে না। ছয় জাতির সঙ্গে ইরানের সাক্ষরিত পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে এই অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় ২০১৮ সালের ৮ মে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার ঘোষণার মধ্য দিয়ে। চুক্তির প্রধান শর্ত ছিল ইরান তার দেশের ইউরেনিয়ামের মজুত দুই-তৃতীয়াংশ কমিয়ে আনবে।  

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, ইরানের সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতের বিষয়টি তিনি উড়িয়ে দিতে পারছেন না। আর ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ইরান ইউরেনিয়ামের মজুদ বাড়াবে এবং একই সঙ্গে ইউরেনিয়াম বিক্রিও করবে। ইরানের জ্যেষ্ঠ ধর্মীয় নেতা ইউসুফ তাবাতাবেই-নেজার হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক নৌযান ইরানের কেবল একটি ক্ষেপণাস্ত্রেই ধ্বংস হয়ে যেতে পারে।
মিথ্যাচারের বিষয়টি যদি লক্ষ্য করেন তাহলে দেখবেন- পেন্টাগনের দাবি, মার্কিন বাহিনী ও তাদের স্বার্থের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অভিযান চালাতে ইরানের প্রস্তুতির পরিপ্রেক্ষিতেই এই পদক্ষেপ। ইরান প্রতিবেশী ইরাকে অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করেছে, যা সেখানে অবস্থানরত মার্কিন সেনাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন যুদ্ধজাহাজ ও বোমারু বিমান মোতায়ন নিয়ে যা বলেছেন তাহলো, ইরানের কাছে খুবই স্পষ্ট ও নির্ভুল বার্তা দিতেই এই ব্যবস্থা। এর মধ্যেই পারস্য উপসাগরে সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপকূলে সৌদি আরবের দু’টি তেলবাহী ট্যাংকারসহ চারটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনায় ইরানকে একপাক্ষিকভাবে দোষারোপ করার চেষ্টা করা হচ্ছে। যেটাকে আপনি ব্লেম গেমের অংশ হিসেবে ধরে নিতে পারেন। 

সমর প্রস্তুতি ও বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কমান্ডার মেজর জেনারেল হোসেন সালামি ইরানের পার্লামেন্ট অধিবেশনে তার দেওয়া বক্তব্যে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলে মনস্তাতিক যুদ্ধ শুরু করেছে। পেন্টগনের ভাষ্য হলো, মার্কিন সৈনদের বিরুদ্ধে হুমকি মোকাবেলায় তারা প্রস্তুতি নিচ্ছে। এখন মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এক্ষেত্রে ইরানের কী কোন ভূমিকা আছে? না যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের বিরুদ্ধে একতরফাভাবে যুদ্ধ চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। উত্তর হলো, স¤প্রতি ইরানি পার্লামেন্টে পাশ হওয়া একটি আইন যুক্তরাষ্ট্রকে ভাবিয়ে তুলেছে। আইনটিতে সব মার্কিন সৈনদের মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।   

এখন দেখা যাক সম্ভাব্য ইরানের ওপর সামরিক হামলা নিয়ে ভিতর ভিতর কারা কলকাঠি নাড়ছে। মার্কিন সংবাদপত্র ওয়াশিংটন পোষ্টের এক প্রতিবেদন মতে, হোয়াইট হাউসের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টন গত বছরই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলেছিলেন। এ বছরের ফেব্র“য়ারিতে ইরানে ইসলামিক বিপ্লবের ৪০তম বার্ষিকী উপলক্ষে এক ভিডিও বার্তায় তিনি ইরানের নেতাদের উদ্দেশে বলেন, অভিনন্দন। খুব বেশি দিন আর বিপ্লবের বার্ষিকী উদযাপন করতে হবে না আপনাদের। পত্রিকাটির মতে, ইরানের ওপর নতুন নিষেধাজ্ঞা, দেশটির রেভল্যুশনারি গার্ডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা ও ইরানের সাথে পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের পেছনে বোল্টনের হাত রয়েছে।  

এতো গেল একজন ব্যক্তি। আসলে এক্ষেত্রে বড় নিয়ামক যে শক্তিটি পর্দার আড়াল থেকে কলকাঠি নাড়াচ্ছে সে হলো ইসরায়েল। মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল তার নিরাপত্তা নির্বঘœ ও অক্ষুন্ন রাখতে চায়। এক্ষেত্রে ইরান হলো তার সবচেয়ে শক্ত বাধা। ধারণা করা হয়-মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েল হলো একমাত্র পারমাণবিক শক্তি সমৃদ্ধ দেশ।  আর সে চায় না এ অঞ্চলের অন্য কোন দেশ পারমাণবিক সক্ষমতা অর্জন করুক। এ জন্য তারা সম্ভাব্য সবকিছু তার মিত্রদের নিয়ে করতে সবসময় প্রস্তুত ও বিগত দিনেও সফলভাবে করে এসেছে।   

এর আগে, ২২ সেপ্টেম্বর১৯৮০-২০আগস্ট ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলা ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ১৯৮০ সালের ৩০ সেপ্টম্বর ইরানের বিমানবাহিনীর দু’টি ফ্যান্টম-৪ যুদ্ধবিমান ইরাকের ওসিরাক পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা চালায় ও এর আংশিক ক্ষতিসাধন করে। ফ্রান্স দ্রুত ইরাকের চুল্লী মেরামত করে দিলে ইরানের আক্রমণের লক্ষ্য ব্যাহত হয়। তবে কিছুদিনের মাঝেই চুল্লীটি ইসরায়েলের চোরাগোপ্তা হামলা চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেয়। ২০০২ সালে ইসরায়েল আবারো ওসিরাকে বিমান হামলা চালায়। একথা আমরা এখন সকলে জানি ইরাক-ইরান যুদ্ধের সময় ইসরায়েল অস্ত্র দিয়ে ইরানকে সহযোগিতা করেছিল।  
আবার, ২০১১ সালের ২৬ জানুয়ারি সিরিয়ায় শুরু হওয়া গণ বিক্ষোভ প্রদর্শন যা অভ্যুথানে রুপ নিয়ে গৃহযুদ্ধ হিসেবে চলমান আছে। এই গৃহযুদ্ধের মধ্যে ২০০৭ সালের সেপ্টম্বর মাসে সিরিয়ার একটি স্থাপনায় হামলা চালায় ইসরায়েল। ইঙ্গ-মার্কিন বিশ্লেষকদের মতে, সিরিয়ার ঐ স্থাপনায়  ইরানের সহযোগিতায় পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করা হয়েছিল।   

সিরিয়ার ঘটনা লক্ষ্য করলে আমরা দেখব, সিরিয়ায় বিক্ষোভকারীদের দবি ছিল রাষ্ট্রপতি বাশার আল-আসাদের পদত্যাগ, তার সরকারের ক্ষমতাচ্যুতি ও সিরিয়ায় দীর্ঘ ৫ দশকের আরব সোশ্যালিস্ট বাথ পার্টির শাসনের পতন। যার কোনটিই এই যুদ্ধে অর্জন করা সম্ভব হয় নি। কিন্তু ইসরায়েল ঠিকই সিরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি ধ্বংস করে দিতে সক্ষম হয়েছে। এ অঞ্চলে এখন আর শুধু ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা বাকি আছে ইসরায়েলের। এর আগে বহুবার তারা একক প্রচেষ্টায় তা ধ্বংস করার হুঁমকি দিয়েছে ও চেষ্টা করেছে কিন্তু সফল হয়নি।

ইরানের ঘোষিত পারমাণবিক স্থাপনা পাঁচটি। এগুলো হলো, নাতাগঞ্জ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট, ফর্দো ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট,আরাক ওয়াটার প্ল্যান্ট, ইস্ফাহান ইউরেনিয়াম মজুদকরণ প্ল্যান্ট, এবং পারচিন সামরিক স্থাপনা। এদের ভেতর প্রথমটি ভূ-অভ্যন্তরে ও দ্বিতীয়টি পার্বত্য এলাকার অনেক গভীরে  সুরক্ষিত স্থাপনা। তাই বলা যায়, ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস করা খুব সহজ হবে না। সাথে ইরানের সবচেয়ে বড় অংশিদার চীন হাত গুটিয়ে বসে থাকবে না। যুক্তরাষ্ট্র চীনের সাথে ইতোমধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ বাধিয়েছে। আর অপর পরাশক্তি রাশিয়াও যে জোরালো ভূমিকা রাখবে একথা জোর দিয়ে বলা যায়। এরই মধ্যে সিরিয়ার তারতুস বন্দরে স্থায়ী নৌ-ঘাঁটি নির্মাণ ও লাতাকিয়া শহরে একটি বিমান ঘাঁটি বানাচ্ছে রাশিয়া। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে তার শক্ত অবস্থান পাকাপোক্ত করতে সবকিছু করে যাচ্ছে।      

জটিল সব সমীকরণের মধ্যে সম্ভাব্য ইরান সংকট নিয়ে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সদস্য স্টেইনিতজ স¤প্রতি বলেছেন, ইরানের সঙ্গে তার প্রতিবেশী দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত শুরু হলে ইরান যে হিজবুল্লাহ ও গাজায় ইসলামিক জিহাদকে সক্রিয় করবে না, তা আমি উড়িয়ে দিতে পারছি না। সিরিয়ায় চলমান গৃহযুদ্ধের মধ্যে ইসরায়েল ও ইরান অবশ্য প্রক্সি যুদ্ধ সেরে নিয়েছে। সিরিয়ায় ইরানের অবস্থানের ওপর ইসরায়েল অনেক বার হামলা করেছে। তারপরও সিরিয়ায় ইরানের শক্ত অবস্থান ইসরায়েলকে ভাবিয়ে তুলেছে। ইরান ও রাশিয়া মূলত বাশার আল-আসাদকে সিরিয়ার রাষ্ট্রক্ষমতায় টিকিয়ে রেখেছে। যা ইসরায়েল ও তার মিত্রদের একটা বড় পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। ইরান নিয়ে ইসরায়েলের আরও একটি মাথাব্যথার কারন হলো ফিলিস্তিনের হেজবুল্লাহ ও হামাসের উপর ইরানের প্রভাব বৃদ্ধি। যা তারা ইরানের শক্তি নিশ্বেস করার মধ্য দিয়ে অবসান করতে চায়।  

সম্ভাব্য ইরান সংকট নিয়ে আর প্রধান যে কারণটির কথা ভাবা হচ্ছে, তাহলো ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। এর আগে ২০০৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগের বছর সাবেক প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ ইরাক আক্রমণ করে নিজের পক্ষে জনমত টানতে চেয়েছিলেন ও সফলও হয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে উল্লেখ করার মতো কোন কিছুই অর্জন করতে পারেননি। তিনি উত্তর কোরিয়ার সাথে পারমাণবিক অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি করতে ব্যর্থ হয়েছেন। চীনের সাথে বাণিজ্য যুদ্ধ বাধিয়ে নিজ দেশে সমালোচনার মুখে আছেন। তার সামনে এখন শুধু ইরানে হামলা করার মাধ্যমে নিজেকে যুক্তরাষ্ট্রের বলিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রমাণ করার মোক্ষম সুযোগ রয়েছে। 

ধারণা করা যায়, তিনি তা করতে পারেন। এটা করলে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কট্টোর ভোটার, ইহুদি লবি ও বন্ধু রাষ্ট্র ইসরায়েলকে খুশি করতে পারবেন। আর আমরা কে না জানি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ইহুদি লবির ক্ষমতা ও ভূমিকা কত ব্যাপক। বলা হয়ে থাকে-যুক্তরাষ্ট্রে ইহুদি লবি না চায়লে কেউই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে পারেন না। আর এবার নির্বচনের আগের বছর ইরানের উপর হামলা করে দ্বিতীয় মেয়াদের নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বচনি ট্রাম্প কার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। 


কবিতা

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে আমি তোমাকে এঁকে ফেলি।   তোমার ছবি তখন আমার সাথে কথা কয়। তখন মায়াপুরিবেলা ভাসতে আর ভাসাতে নেই কোন মানা,   ...