রবিবার, ২৩ জুন, ২০১৯

হাইব্রিড গণতন্ত্র

হাইব্রিড কথাটি পজিটিভ অর্থেই ব্যবহৃত হয় সাধারণত। বর্তমান পৃথিবীতে শস্য-সবজি, গাড়ি থেকে শুরু করে ওয়েব দুনিয়া সব ক্ষেত্রে বহুল ব্যবহৃত শব্দ এটি। জাতীয় কৃষি তথ্য সার্ভিস (এআইএস)’র তথ্য মতে, অধিক ফলন, আকর্ষণীয় চেহারা, স্বল্প জীবনকাল, বিভিন্ন পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা, রোগ ও পোকার অধিক সহনশীলতা, প্রায় একই সময়ে পরিণত হওয়া, বাজারে অধিক চাহিদা, পুষ্টিকর ইত্যাদি নানাবিধ কারণে হাইব্রিড জনপ্রিয় হয়ে উঠছে দিনদিন। জনপ্রিয় এই ধারণাটি কিন্তু রাজনীতিতে ব্যবহৃত হয় নেগেটিভ অর্থে।  

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীদের হাইব্রিড বলে একগাল গালমন্দ করা হয় দলে সমস্যা দেখা দিলেই। দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের হাইব্রিডদের ‘কাওয়া’ সম্বোধন করে রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন। রাজনীতিতে হাইব্রিডরা হলো সুযোগ সন্ধানী। এরা ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থাকতে চায়। এদের কাছে নীতি, আদর্শ, দল বড় কথা নয়। ক্ষমতার খুব কাছাকাছি থেকে এরা রান্নকরা মাছের মাথাটি খেতে চায়। এদের দাপটে কাদা-জল মেখে যেসব নিবেদিত দলীয় অন্তঃপ্রাণ নেতাকর্মী ক্ষমতা নামক মাছটা কড়াই পর্যন্ত নিয়ে আসে, তারা বঞ্চিত হয়ে পড়ে। 

হাইব্রিড নেতার সমস্যা দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলেই বিদ্যমান। এদের দাপটে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের তৃণমূল ও মাঠপর্যায় থেকে কেন্দ্রীয় অনেক নেতাকর্মী রাজনীতি থেকে অনেকটা স্বেচ্ছা অবসরে চলে গেছেন। আর বিএনপি কাছে এটি হাইব্রিড না বলে পরগাছা সমস্যা বলাই যুক্তিযুক্ত। দলটির শরিক দল জামাতের নেতাকর্মীদের দাপটে মূল বিএনপির নেতাকর্মীরা বিলিন হওয়ার পথে। মৌসুমী ও সুযোগসন্ধানী এসব হাইব্রিড ও পরগাছা নেতাকর্মীদের দাপটে দেশের রাজনীতির চেনা মাঠ বড় বেশি অচেনা মনে হয়। যার সুদূরপ্রসারী প্রভাব আমাদের গণতন্ত্রের উপর পড়ছে। 

দেশে বিদ্যমান গণতন্ত্র নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই। একদিনের গণতন্ত্র, নির্বাচিত একনায়কতন্ত্র বির্বচনের ব্যবস্থা, নির্বাচনী গণতন্ত্রসহ অনেক নামেই ডাকা হয় একে। বাম গণতান্ত্রিক জোটের ভাষায় বিদ্যমান গণতন্ত্র হলো,‘ স্বৈরাতান্ত্রিক দুঃশাসন-জুলুম-লুটপাটের’ ব্যবস্থা। আবার, ইকোনমিক ইনটেলিজেন্স ইউনিট(ইআইইউ) এর বৈশ্বিক প্রতিবেদন মতে,‘হাইব্রিড গণতন্ত্র’। হাইব্রিড গণতন্ত্র বলতে, এমন ব্যবস্থা বোঝায় যেখানে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা প্রায়ই ব্যাহত হয়। এ ছাড়া বিরোধীদের ওপর রাজনৈতিক চাপ, দুর্নীতি, আইনের শাসন ও নাগরিক সমাজ দুর্বল। হাইব্রিডের ইন্ডিকেটরগুলোর বিশ্লেষণ ও বর্তমান প্রেক্ষাপটে মিলিয়ে নেওয়ার ভার সচেতন পাঠকের কাছেই রইলো। 

আমাদের গণতন্ত্র যে দুর্বল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। দেশে নির্বাচন যত কাছাকাছি হয় গণতন্ত্রের দুর্বল দিকগুলো তত বেশি প্রকাশিত হতে থাকে। নির্বচন এলেই- কী হবে এবার? ভাবনায়, সংশয় ও সংকটের দোলাচলে সাধারণ জনগণ পেন্ডুলামের মতো দুলতে থাকে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকার টিকবে কি টিকবে না তা নির্ভর করে জনগণের ইচ্ছার উপর। আমাদের দেশে বাস্তবতা অবশ্য ভিন্ন। অবস্থাদৃষ্টিতে মনে হয়, ব্যবসায়ী,আমলা ও দরবেশদের চাওয়াই হলো শেষ কথা।

দশম জাতীয় সংসদের কথা ধরা যাক। দশম সংসদের মূল ৩০০ জন  সাংসদদের মধ্যে ২০৬ জনই ছিলেন ব্যবসায়ী। সংরক্ষিত নারী আসনসহ  সাংসদদের পেশার চিত্র হলো, ব্যবসায়ী ২১৪ জন, আইনজীবী ৪৮ জন, রাজনীতি পেশা ২২ জনের ও অন্যরা। শতাংশের হিসেবে, ব্যবসায়ী এমপির হার ৬৯ শতাংশ। সাংসদের সবাই যে কোটিপতি তা সহজে অনুমেয়। কোটিপতি এসব ব্যবসায়ী রাজনীতিক রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহার করে তাদের ব্যবসার পরিধি বাড়াতে ও অধিক মুনাফা ছেঁকে তোলার জালের পরিধি বিস্তৃত করতে মনোযোগী হওয়টাই স্বাভাবিক। ফলে প্রকৃত গণতন্ত্র নিয়ে কারও মাধাব্যাথা নেই।      

দশম সংসদের পরিসংখ্যানই বলে দেয়, রাজনীতি আর রাজনীতিবিদদের হাতে নেই। রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ীদের পকেটে। বলার অপেক্ষা রাখে না ব্যবসায়ীদের প্রধান লক্ষ্য হলো মুনাফা অর্জন। হচ্ছেও তাই। ব্যবসায়ী রাজনীতিবিদরা রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে অঢেল সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে। বিশ্বে অতিধনী বৃদ্ধির প্রবনতায় বাংলাদেশর এক নম্বরে ( ১৭.৩%) অবস্থান এর সবচেয়ে বড় প্রমাণ। ফলে দেশে সম্পদের সুষম বন্টন হুমকির মুখে। কতিপয় ব্যবসায়ী ও তাদের স্টেকহোলডাররা দেশের অধিকাংশ সম্পদের মালিক বনে যাচ্ছে। ফলে দেশের ৯০ শতাংশ মানুষ সম্পদ বঞ্চিত থেকে যাচ্ছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে কোথাও কোন উত্তাপ আমরা দেখিনি। একধরনের নিরবতা আপনি কান পাতলেই এখনও শুনতে পাবেন। এই সুযোগে, ব্যবসায়ী, প্রবাসী, তারকা খেলোয়ার থেকে তারকা কমিক চরিত্র ও অবৈধ সম্পদ অর্জনকারী সাবেক আমলারা নমিনেশনের ইঁদুর দৌড়ে প্রধান আলোচনায় ছিলেন। সাবেক সেনাকর্মকর্তা, এফবিসিসিআই, বিজিএমই, বিকেএমই, স্বর্ণ ব্যবসায়ী, ব্যাংক,বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান, শিল্পগ্র“পের মালিকসহ কে ছিল না সেই আলোচনার পদ প্রদীপে। 

একাদশ জাতীয় সংসদেও সংসদ সদস্যদের মধ্যে ৬৩.৩৩ শতাংশ ব্যবসায়ী। এদের একটি উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আবার পোশাকশিল্প ব্যবসায়ী। ফলে এবছরের অর্থাৎ ২০১৯-২০২০ সালের বাজেট পোশাকশিল্প খাতে ভর্তুকি বাবদ বাজেটে বরাদ্দ ২ হাজার ৮২৫ কোটি টাকা। যেখানে দেশের প্রাণ কৃষকরা উপেক্ষিত রয়েগেছে। এবারের বাজেট দেখে মনে হয় দেশের একটা বিশেষ ধনীক শ্রেণীকে সুবিধা দিতেই যেন তা প্রণয়ন করা হয়েছে। যদিও দেশের সাধারণ মানুষের চাওয়া ভিন্ন। 

নির্বাচন এদেশে চরম আকাঙ্খিত একটি অনুষ্ঠান। বর্তমান বাস্তবতা হলো, দেশে কোন নির্বাচন এলে এলাকার সৎ ও দীর্ঘদিনের রাজনৈকতিক নেতা-কর্মীরা থাকে দর্শকের ভূমিকায়। তাদের সান্ত্বনার নাম তৃণমূল। সরাজীবন রাজনীতি করে জেল-জুলুম ভোগ করে এরা তৃণমূল! তৃণমূলের কাজ হলো, নমিনেশন চুড়ান্ত পর্বের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকা। দেখা, কোন বড় ব্যবসায়ী বা টাকা ওয়ালা এমপি, মেয়র বা উপজেলা চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে চুড়ান্ত হচ্ছেন। অবস্থা এমন, তৃণমূল রাজনীতির বৃক্ষটিকে পরিচর্যা করে ফল ধরাবে আর অন্য একজন ধুমকেতুর মতো হাজির হয়ে, গাছে উঠে ফল খাবে। তাহলে মাঠ পর্যায়ে রাজনীতি করে কী লাভ? এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর না পেয়ে এখন সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা টাকা কামানোর দৌড়ে নিজেদের সামিল করে নিচ্ছে। 

লাভ-ক্ষতির ঝুকির প্রশ্নে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কবলে দেশের গণতন্ত্র ও শাসন ব্যবস্থা। প্রকৃত গণতন্ত্রের চর্চার অনুকূল পরিবেশ বর্তমান ব্যবস্থা দিতে পারছে না। এই সুযোগে সুযোগসন্ধানীরা ঘোলা জলে মাছ শিকার করে নিয়ে যাচ্ছে। দেশের রাজনীতিতে নীতি ও আদর্শের চর্চা করার সবচেয়ে কঠিন সময় এসে গেছে। সময় থাকতেই শক্তিশালি পদক্ষেপ নিতে হবে। তা না হলে রাজনীতি আর কোন ভাবেই রাজনীতিবিদদের হাতে থাকবে না। চলে যাবে দূর্বৃত্তদের বুকপকেটে ও ম্যানিব্যাগে। 

দেশের রাজনীতি ও সকল সুযোগ সুবিধা বিশেষ একটা শ্রেণীর পকেটে যে চলে যাচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। হিরো আলম যেমনটা বলেছিলেন, এমপি-মন্ত্রীরা চায় না প্রজারাও রাজা হোক। হিরো আলম শ্রেণী বৈষম্য ও শ্রেণী সংগ্রাম নিয়ে তার মতো করে বলেছে। জিরো থেকে হিরো হয়েছে সে। সে কোন সাবেক এমপি-মন্ত্রী বাবা-মায়ের সন্তান না। প্রবাস থেকে টাকার থলে হাতে দেশে আসেনি। কয়লা-ব্যাংক-শেয়ারবাজার খেয়ে ফেলেনি। বিদেশে টাকা পাচারসহ সেকেন্ড হোম বানায়নি। নির্বচন যখন করবো, বড়টাই করবো-ফরম ক্রয় পর্বে হিরো আলোম এমনটাই বলেছিলেন। বড় নির্বাচন ঠিক কতখানি বড়, তা তিনি এখন হাড়েহাড়ে টের পাচ্ছেন। 

গণতন্ত্রে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠ নির্বাচন সবার আগে জরুরি। সবার জন্য সমান সুযোগ তৈরী কাজটি করতে হয় নির্বাচন কমিশনকে। এবছর রোজার সময় সংস্থাটি ইফতার আয়োজন করে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণীর মানুষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন ও বিশেষ ও সাধারণ মেনু পরিবেশন করেছে। এ নিয়ে অনেক কলমজীবী জাতীয় পত্রিকাগুলোতে কলাম লিখে প্রশ্ন রেখেছেন, যারা ইফতারির মতো একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সকলের জন্য সমান খাবারের মেনু পরিবেশন করতে পারে না তারা কিভাবে নির্বাচনের মতো একটি জটিল কর্মে নিরপেক্ষতা দেখাবেন? আমাদের দুর্ভাগ্য দেশে প্রতিবেশী ভারতের সাবেক নির্বাচন কমিশনার টি এন সেশনের মতো একজন মেরুদন্ড ওয়ালা প্রধান নির্বাচন কমিশনারের এখন পর্যন্ত দেখা নেই। বড় চাওয়া! পাওয়ার জন্য প্রতীক্ষার দীর্ঘ প্রহর গণনাতো করতেই হবে। 

দেশে এখন উপজেলা নির্বাচন চলছে। প্রধান বিরোধী দল(সাধারণ মানুষের মতে) বিহীন নির্বাচন কেমন হচ্ছে? এ বিষয়ে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগর নেতৃত্বাধীন ১৪-দলীয় জোটের শরিক দল ওয়ার্কাস পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বক্তব্য প্রণিধানযোগ্য। তিনি বলেছেন, নির্বাচন নিয়ে মানুষ আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে। উপজলা নির্বাচনেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। মসজিদে ঘোষণা দিয়েও ভোটারদের আনা যায় না। 
স¤প্রতি উপজেলা নির্বাচন নিয়ে জাতীয় পত্রিকা ও অনলাইন পত্রিকাগুলোর পরিবেশিত নিউজগুলোই একটা ছবি খুব কমন- ফাঁকা নির্বাচন কেন্দ্রে কুকুর ঘুমাচ্ছে। বলা হয়, কুকুর খুবই প্রভুভক্ত প্রাণী। কোন কারণে কুকুরের প্রভু যদি মারা যায় বা তাকে ছেড়ে গোপনে অন্যত্র চলে যায় তারপরও সে প্রভুর ভিটা পাহারা দেয়। এর বিপরীত চরিত্র বিড়ালের। প্রভু মারা গেলে বিড়াল অন্যত্র চলে যায়। যেকোন নির্বাচন এ দেশে একসময় উৎসবের মতো ছিল। সাধারণ জনগণের এই নির্বাচন বিমুখীতা আমাদের গণতন্ত্রের জন্য খুবই বিপজ্জনক। গণতন্ত্র ও দেশের মানুষের স্বার্থে নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বচন খুব জরুরী। 

নিরপেক্ষতার বিপরীত পক্ষপাতিত্ব বিষয়টি এমন- তা আপনার পক্ষে গেলে টের পাবেন না, আর যদি বিপক্ষে যায় তবে তা অবশ্যই টের পাবেন। পক্ষ-বিপক্ষের চলমান দ্বদ্বে কোনভাবেই যেন আমাদের গণতন্ত্র হোচট না খায়। সেদিকে সকল পক্ষকে খেয়াল রাখতে হবে। নির্বাচনী উৎসবের শতরং দেশ ব্যাপি আবার ছড়িয়ে দিতে হবে ইসিকেই। রাজনীতিবিদ ও ইসিকে মিলেই এই কাজটি করতে হবে। তারা যদি তা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে হাইব্রিড গণতন্ত্রের মানদন্ডেই ঘুরপাক খেতে থাকবে দেশের গণতন্ত্র। 

বুধবার, ১৯ জুন, ২০১৯

ঋণ

বঁধু বাঁকা চোখে চায়
বরেন্দ্রভূমি কেঁপে ওঠে
বেশ্যার বালিশ বিলাসিতায়।
জাহাজের কারবারি করে আদার খোঁজ
ব্রান্ডি তামাক খেয়ে নিতে চায় জোশ।
বেশ্যা বিচারক হয় স্বতিত্বের পরীক্ষায়
বরুণ সাগরপাড়ে আগুন তাপায়।
কুকুর চাটে বিড়ালের ঠোঁট
মিনসে গড়ে সংসারত্যাগী জোট।
বেসুরে বাঁজে বর্ণপরিচয়
লক্ষপতি ডাস্টবিনে খাবার হাতড়ায়।
রৌপ্য সৌন্দর্য্যে হেরে যায় লোহার কাছে
বেশ্যালয়ের কাছে বিদ্যার্থীর অনেক ঋণ আছে।

মঙ্গলবার, ১৮ জুন, ২০১৯

ইনন পরিকল্পনা ও জ্বলন্ত মধ্যপ্রাচ্য

স¤প্রতি সময়ে হরমুজ প্রণালীতে তেলবাহী জাহাজের উপর হমলার ঘটনা বাড়ছে। কে বা কারা এ হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে তা জানা না গেলেও- ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র ইসরায়েল প্রতিটি হামলার জন্য ইরানকে একতরফাভাবে দোষারোপ করছে। 

পারস্য উপসাগরে মার্কিন রণতরী ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন সাথে অপর যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আলিংটন মোতায়ন আছে। সাথে কাতারে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিতে বেশ কয়েকটি বি-৫২ বোমারু বিমান মোতায়ন করা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে ১ লক্ষ ২০ হাজার সেনা মোতায়নের ঘোষণা দিয়েছে ক’দিন আগেই। এই সংখ্যক সেনা এর আগে ইরাক যুদ্ধের সময় মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়ন করা হয়েছিল। সব ঘটনাপ্রবাহকে একসাথে মিলালে মনে হতে পারে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ আসন্ন। কিন্তু কেন? ইরানের বিরুদ্ধে কেন যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের এই যুদ্ধ-যুদ্ধ সাজ?

বিষয়টিকে গভীরভাবে বুঝতে আপনাকে ইসরায়েলের ইনন পরিকল্পনা ও সিরিয়ায় আসাদ সরকারকে হঠাতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ব্যর্থতাকে বুঝতে হবে।     

জেরুজালেম পোস্টের সাংবাদিক ও ইসরায়েলের সাবেক প্রধানমন্ত্রী অ্যারিয়েল শ্যারন এর উপদেষ্টা ওদেদ ইনন হিব্র“ জার্নাল কিভউনিম এ ১৯৮২ সালে একটি আর্টিকেল লেখেন।  যার নাম ছিল,‘এ স্ট্রাটিজি ফর ইসরায়েল হন দ্য ১৯৮০’স। ওদেদ ইননের এই আর্টিকেল থেকেই ‘ইনন পরিকল্পনা’ ধারণাটির উৎপত্তি। ওদেদ ইনন এর নামানুসরেই এর নামকরন করা হয়েছে ‘ইনন পরিকল্পনা’। এই ‘ইনন পরিকল্পনা’ হলো বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার একটি মহা  পরিকল্পনা। এটিকে ইসরায়েলের সরকার, প্রতিরক্ষা বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। 

এই ‘ইনন পরিকল্পনা’র দু’টি গুরুত্বপূর্ণ অংশ আছে। একটি হলো- ইসরায়েলকে একক আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি হতে হবে। আর অপরটি হলো-বিখন্ডীকরণ করে সব আরব রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটাতে হবে। এ বিভাজন নৃগোষ্ঠি ও ধর্মীয় গোষ্ঠীর বিভাজন রেখা বরাবর হবে। এসব ক্ষুদ্র রাষ্ট্র ইসরায়েলের আশ্রিত হবে। ইসরায়েল হবে সেগুলোর নৈতিক বৈধতার উৎস। 

এই পরিকল্পনায় মিসর, লেবানন ও ইরাকের বিভাজনের কথা বলা হয়েছে। সিরিয়া, সুদান, ইরান, তুরস্ক, সোমালিয়া, পাকিস্তান, লিবিয়া ইনন পরিকল্পনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। দেশগুলো ভেঙ্গে সেখানে তৈরী হবে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র রাষ্ট্রসমূহ। যে রাষ্ট্রসমূহের টিকে থাকার মূল ভিত্তিই হবে ইসরায়েলোর চাওয়া বা না চাওয়া। রাষ্ট্রগুলোকে মূলত নিয়ন্ত্রণ করবে ইসরায়েল। সামরিক দিক দিয়ে তারা কখনই ইসরায়েলের জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচিত হবে না। 

মিশরের উত্তর অঞ্চলের একটা অংশে একটি খ্রিস্টান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কথা বলা আছে এই পরিকল্পনায়। ইরাককে ভেঙ্গে তিনটি রাষ্ট্রের কথা বলা হয়েছে এতে। বসরা নগরীকে রাজধানী করে শিয়াদের একটি রাষ্ট্র, বাগদাদকে রাজধানী করে সুন্নীদের একটি রাষ্ট্র আর মসুলকে রাজধানী করে কুর্দীদের জন্য একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করা হবে। 

ইনন এর মতে তেল সমৃদ্ধ ইরাক ইসরায়েলের জন্য বড় হুমকী। এবং বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পথে ইরাক বড় কৌশলগত বাধা। এই বাধা দূর করার প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে ইরাক-ইরান যুদ্ধ বাধানো হয়। ২২ সেপ্টেম্বর১৯৮০-২০আগস্ট ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত চলে সে যুদ্ধ। এরপর ২০০৩ সালে ইরাক আগ্রাসন, ২০০৬ সালে লেবানন যুদ্ধ, ২০১১ সালে লিবিয়া যুদ্ধ, এবং বর্তমানে চলমান সিরিয়া, ইরাক ও ইয়েমেনের যুদ্ধ সবই এই একই ইনন পরিকল্পনার অংশ।  

‘ভাগ কর ও শাসন কর’ ব্রিটিশ নীতির এ যেন আর এক ইসরায়েলই সংস্করণ। ইসরায়েলের স্বপ্নদ্রষ্টা অষ্ট্রিয়ান সাংবাদিক থিওডর হার্জেল। তার বই ‘জুডেনস্টাট’ বা ‘ ইহুদি রাষ্ট্র’। এই বইতে ধর্মভিত্তিক উপখ্যান ও মিথোলজিকে ইতিহাসের সাথে মিশিয়ে খিচুড়ি পাকিয়ে তৈরী করা হয় ইসরায়েল রাষ্ট্র। যা ইহুদিদের জন্য ঈশ্বরের প্রমিজড ল্যান্ড বা প্রতিশ্র“ত ভূমি। তারাই ঈশ্বরের মনোনিত স¤প্রদায় বা চোজেন পিপল।  মহাপ্রভু তাদের প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন যে দুধ ও মধুর এই দেশে তারা শান্তিতে বসবাস করবে। তা বটে! তবে তারা ইসরায়েলে শান্তিতে বসবাস করতে গিয়ে অন্যান্য দেশগুলোর শান্তি হারাম করে ফেলছে।  

তো, ইহুদিদের এই ঈশ্বরের ‘প্রমিজড ল্যান্ড’ বা ‘প্রতিশ্র“ত ভূমি’ কত বড়? ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ১৮১ নম্বর প্রস্তাব অনুসরে ৫৫ শতাংশ যে ফিলিস্তিনী ভূমি ইহুদিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়, সেইটুকু; না আরও বিশাল এই প্রতিশ্র“তভূমি? জায়নবাদের জনক থিওডর হার্জলের ধারণা অনুযায়ী, ইহুদি রাষ্ট্র মিসরের নদী নাহাল মিজারাইম তথা নীল নদ থেকে ইরাকের ফোরাত পর্যন্ত বিস্তিৃত। রাব্বি ফিশমানের মতে, প্রতিশ্র“ত ভূমি ‘মিসর নদী’ থেকে ‘ফোরাত নদী’ পর্যন্ত বিস্তিৃত; সিরিয়া ও লেবাননের অংশবিশেষ এর অন্তর্ভুক্ত। 

তার মানে হলো, এই বিশাল এলাকা জুড়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। ‘ডিল অব দ্য সেঞ্চুরি’-তে বৃহৎ ইসরায়েল প্রকল্পের প্রতি সমর্থন দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। অন্যদিকে, ফিলিস্তিনিদের স্বদেশে প্রত্যাবর্তনের অধিকারের দাবিকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত সমঝোতায় লেবানন, জর্দান, সিরিয়া, ইরাক ও অন্যান্য দেশে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের নাগরিকত্ব দিতে বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে ১৪ মে, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে উদ্বোধন করা হয়েছে। যে দিনটিকে ফিলিস্তিনীরা ‘নাকবা’ বা ‘বিপর্যয়ের দিন’ হিসেবে পালন করে থাকে। দিনটি অবশ্য ইসরায়েলের প্রতিষ্ঠার দিন। 

মানে হলো, এক রাষ্ট্র সমাধান। শুধু ইসরায়েল থাকবে; ফিলিস্তিন বলে যা ছিল, তা মুছে যাবে। এখানে আপনিও সাবেক মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরীর মত প্রশ্ন করতে পারেন- তাহলে বর্তমানে বসবাসরত ফিলিস্তিনীরা কোথায় যাবে? যদি তাদের তাড়িয়ে দেওয়া না হয়- তাহলে তাদের নাগরিকত্বের ধরণ কিরূপ হবে? এই প্রশ্নের উত্তর অনগত ভবিষ্যতই দেবে। 

ভবিষ্যত রেখে আমরা বর্তমানে আসি। ২৬ জানুয়ারি, ২০১১ সালে সিরিয়ায় শুরু হওয়া গণ বিক্ষোভ প্রদর্শন; যা অভ্যুথানে রুপ নিয়ে গৃহযুদ্ধ হিসেবে চলমান আছে। চলমান এই গৃহযুদ্ধে দুটি গ্র“প সক্রিয় আছে। এক-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সমর্থিত আইএস ও আল নুসরা সন্ত্রাসী বাহিনী। দুই- রাশিয়া, ইরান  ও হিজবুল্লাহ সহায়তায় সিরিয় বাহিনী। সিরিয়ায় এখন মূলত চলছে প্রক্সি যুদ্ধ। এবং বলার অপেক্ষা রাখে না ইসরায়েল ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র সিরিয়ায় পরাজিত হতে চলেছে। সিরিয়াকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করার ইসরায়েলের ইনন পরিকল্পনা বাস্তবে মার খেয়েছে। 

এতেই ইরানের ওপর মহা চটেছে ইসরায়েল ও তার মিত্র যুক্তরাষ্ট্র। তাছাড়া ফিলিস্তিনীর হিজবুল্লাহর ওপর ইরানের প্রভাব প্রতিনিয়ত বাড়াতেও কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়ছে ইসরায়েলের। ইরান হিজবুল্লাহকে অস্ত্র, প্রশিক্ষ ও অর্থ দিয়ে ইসরায়েলের বুকের ঠিক কাছটায় বড় ও শক্তিশালী করে তুলছে। যা ইসরায়েলের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ। তাই হিজবুল্লাহকে ধ্বংস ও দুর্বল করতে এর উৎস ও অর্থদাতা ইরানকে ধ্বংস করা ইসরায়েল ও তার মিত্রদের এখন প্রধান এজেন্ডা। 

বলা হয়ে থাকে- ইসরায়েল মাত্র দুই সময়ে হত্যা করে: শান্তিতে ও যুদ্ধে। ইসরায়েল সুনিদিষ্ট সীমানাহীন এক চলমান রাষ্ট্র। সুতরাং তার সেনাবাহিনীকেও চলমান থাকতে হয়। এই রাষ্ট্রটি জন্মের শুরু থেকে আজ পর্যন্ত যুদ্ধ করে টিকে আছে। নিজেকে নিরাপদ ও ধর্মীয় উপকথায় বর্ণিত বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠায় ইসরায়েল রাষ্ট্রের সমস্ত যন্ত্র সক্রিয়ভাবে কাজ করে যাচ্ছে। ফলে জ্বলন্ত ও যুদ্ধাক্রন্ত মধ্যপ্রাচ্য হলো এই অঞ্চলের মানুষের চুড়ান্ত নিয়তি। আর ইরান হলো এখন বৃহৎ ইসরায়েল প্রতিষ্ঠার পথে প্রধান কাঁটা।


সোমবার, ৩ জুন, ২০১৯

চন্দ্রসুধা

গন্ধ
১০
সবাই ভূত দেখতে চাই
প্রায় সকলেই ভূত ভয় পাই
সুযোগ বুঝে ভূত ঘাড় মটকাই।
সরিষার ভিতরেই ভূত-বলে
একটা কথা আছে বাংলায়।
সরিষা হাতে নিয়ে, ভূত দেখার বদলে
আমি সরিষা ইলিশের গন্ধ পাই।

চাওয়া

কখনও কখনও থমকে দাঁড়ায়
পথ হারিয়ে পথিক খুঁজবার আশায়!
মাঝে মাঝে পথের প্রান্তরে থমকে থামি
পথিক হারিয়ে পথ খুঁজবার ব্যাকুলতায়!
পাব না জানি,তবুও দাঁড়ায়।

খেলা

হৃদয় তোমার,আমাকে ছুঁয়েছে
হৃদয়ে-হৃদয়ে খেলা
বল,আমার কী সাধ্য আছে
করবো অবহেলা।

মিছিল

রাজার মতো রাজপথে গিয়ে
তোমাকে যদি পাই
মিছিলের মতো ফালতু কাজ
করে কোন শালায়।

হাঁসি

তোমার মনের অগাধ জলে
প্রেমের নৌকা চলে
জীবন আমার ধন্য হয়ে যায়
এতটুকু হাঁসি দিলে।

ইমা

মন থেকে রইলো শুভ কামনা
দোহায়, ভবিষ্যতে আর গান গেওনা।
মনের ফ্রেমে তুমি
তোমরা দু’জন নদীর দেশের ধুধু মরুভূমি।

কপট

তোমার ভিতর বাস করে হায়ানা
বাইরে থেকে তা দেখা যায় না।
কপটতায় ডেকে রাখ মুখ
দেখলেই মনে হয়, ওখানেই সব সুখ।

ভালবাসা
 ৩
প্রজাপতি মেলেছে ডানা
শোধ দিতে হবে ভালোবাসার দেনা।
ভালোবাসা ভালো না
দিন শেষে, বাকী থাকে কান্না।

ছল

শীতল হাওয়া বুলিয়ে দিতে
আকাশ থেকে নেমে আসে জল,
ভালোবাসার বন্যায় ভাসিয়ে দিতে
প্রিয়া করো না এতটুকু ছল।

প্রতীক্ষা

হেমলকের পিয়ালা হাতে
আমি দাঁড়িয়ে আছি সক্রেটিস
ভাবলেশহীন ভালোবাসায় নিজেকে
নিলীন করে দিতে। 


শনিবার, ১ জুন, ২০১৯

কল্পনা

আমি জেগে জেগে ঘুমায়
আর গভীর ঘুমের মধ্যে জেগে থাকি।
কামনা রাঙ্গা হাতে, তোমার চিবুক ছুঁয়ে দেখি
কল্পনায়!
আমার স্বপ্নীল নদীটির পাড়ে
তোমার হাতে হাত রেখে, হাঁটাহাটি করি।
কসম তোমার
আমি সত্যি বলছি
বিলিন হবো না ।
তোমার উন্মুক্ত বক্ষে
বার বার ফিরে আসবো।
দুটো লাল দালানে
আমি আমার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক এর পাঠ নিয়েছি
সেখানে আমি শ্রদ্ধা আর পুঁজা করতে শিখেছি।
সাঁতার কিংবা ডেউ সৃষ্টি
কোনটিই শিখিনি ।
তোমার কসম
আমি সাঁতার শিখে
তোমার বুকে ডেউ তুলতে আসবো ।

ভাবনা ভ্রংশন

দাঁড়াও বালিকা
দড়িটানা খেলা তোমার না,
ছিড়ে যাবে আদিম সূতা
তা দেখে বর খাবে ধোঁকা।
দাঁড়িয়ে থাকো বারান্দায়
মন দাও রান্নায়।
দাঁড়াকবি গেয়ে বালিকা নবজন্মের পালা শোনায়
দাশ আর দাস এক না
দাসাত্ব ও দাসানুদাস ও এক না
দাসীবৃত্তি আমার আগামীর পেশা না।
দিব্যাঙ্গনার মুখের এমন কথায়
ভ্রংশন হয় ভাবনার।
গেলো গেলো করে তুলে রব
দোদ্যুল্যমান দাদা দাঁড়িতে শান দেয়,
দোষ সব কলি যুগের
দেবযান চালায় অন্ধ পীরে।

কবিতা

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে আমি তোমাকে এঁকে ফেলি।   তোমার ছবি তখন আমার সাথে কথা কয়। তখন মায়াপুরিবেলা ভাসতে আর ভাসাতে নেই কোন মানা,   ...