রবিবার, ১১ নভেম্বর, ২০১৮

চলমান রাজনীতির মহাভারত

বলা হয়ে থাকে- যাহা নাই ভূ-ভারতে, তাহা নাই মহাভারতে। অর্থাৎ ভারতবর্ষের সকল ঘটনা প্রবাহকে মহাভারত মহাকাব্যের সাথে মিলিয়ে নেওয়ার অবকাশ আছে। আমরাও একসময় প্রাচীন ভারতবর্ষের অংশ ছিলাম। তাই মহাভারত আমাদের বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সমান প্রসঙ্গিক। জনপ্রিয় এই মহাকাব্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ। এই ঘটনা কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ বাধিয়ে দেয়। 

সব ঘটনারই পূর্ব ঘটনা থাকে। দুঃশাসন কর্ত্রিক দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ করার চেষ্ঠারও প্রেক্ষাপট আছে। মহাভারতের ঘটনা প্রবাহে, দুর্যোধন, তার সকল ভাই, মিত্র কর্ণ ও মামা শকুনি মিলে পাণ্ডবদের হস্তিনাপুরে পাশা খেলায় আমন্ত্রণ জানান। কৌশল হলো- পাশাখেলায় পারদর্শী শকুনি মামা যুধিষ্ঠিরের বিরুদ্ধে খেলবেন। পরিকল্পনা মতো খেলা শুরু হলো। যুধিষ্ঠির একে একে তার সমস্ত সম্পত্তি, ভাইদের ও নিজেকে বাজি ধরে হেরে গেলেন। এখানে মনে হতে পারে আর কী বাকি থাকলো। চতুর শকুনি যুধিষ্ঠিরকে বললেন, কিছু ধন অবশিষ্ট থাকতে নিজেকে হারালে পাপ হয়, সে যেন তাদের স্ত্রী দ্রৌপদিকে বাজি রেখে নিজেকে মুক্ত করেন। যুধিষ্ঠির দ্রৌপদিকে বাজি রেখে তাকেও হারলেন।

দেশে চলমান একাদশ সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনীতির সাথে বিষয়টি মিলিয়ে দেখার প্রয়াস করা যাক। সকলের মনে আছে, দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে কূটনীতিকদের সাথে বিরোধী দলের বৈঠক আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে ছিলো। এবারও রাজনীতির স্রোত সেদিকেই বইছে বলে মনে হচ্ছিলো। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বললেন, বিএনপির সাথে কোন সংলাপ নয়। সরকারের মনোভাব বুঝে, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সংলাপ চেয়ে সরকারকে চিঠি দিলো। অবস্থা দৃষ্টিতে মনে হতে পারে, ঐক্যফ্রন্ট বা বিএনপি সরকারকে একটা বাউন্সার দিতে চেয়েছিল। যাতে করে তাদের পরবর্তী আন্দোলন ও কৌশলে সুবিধা হয়। কিন্তু তারা হয়তো ভাবিনি সরকার তাদের দেওয়া বাউন্সার পুল করে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে সিক্স মারতে পারে।

গণভবনে রাজনৈতিক দলগুলোর নিজেদের মধ্যে বহু কাঙ্খিত সংলাপ অনুষ্ঠিত হলো। মনে হচ্ছিলো রাজনৈতিক সংকটের বরফ গলতে শুরু করেছে। কিন্তু সংলাপের কোন ফলাফল দৃশ্যমান হওয়ার আগেই প্রধান নির্বচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ৮ নভেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে দিলেন। আগামী ২৩ ডিসেম্বর ভোট। উৎসবমুখর পরিবেশে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন ফরম বিক্রি শুরু হয়েছে। অপরপক্ষে, ফরম বিক্রির কার্যক্রমে বিএনপিতে শ্মশানের নীরবতা। একদিকে বাদ্যবাজনা বাজছে অন্যদিকে হতাশাই খা-খা করছে। 

তাহলে সংলাপের ফল কী দাঁড়ালো? উত্তরে- ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের দাবি সত্য ধরে নিলে, রাজপথে আন্দোলনের পাশাপাশি ঐক্যফ্রন্টের সাথে মিলে সংলাপে অংশ নিয়ে বিএনপি পরাজিত হয়েছে। এক্ষেত্রে আপনি রাজনৈতিক পাশাখেলায় যুধিষ্ঠির ও বিএনপির অবস্থা একই ধরে নিতে পারেন। রাজনীতির কূটকৌশলে পরাজিত বিএনপিকে এখন সরকারের দেখানো পথে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। এছাড়া বিএনপির হাতে খেলার মতো আর কোন কার্ড বাকি নেই। তাদের সব দাবি আদালত আর সংবিধানের পাতায় বন্দী। 

এখন কী হবে? এমন প্রশ্নে আমরা সাধারণ জনগণ দ্রৌপদীর চোখ নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে আছি। এরই মধ্যে রাজনীতির পারদ উঠানামা শুরু করেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতে, একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তফসিল ঘোষণা। অপরদিকে, আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফের আশা, ধোঁয়াশা কেটে গেছে। সবচেয়ে ভয় জাগানিয়া মন্তব্যটি করেছেন, ঐক্যফ্রন্ট নেতা আ স ম আব্দুর রব। তফসিল ঘোষণার তাৎক্ষনিক প্রতিক্রিয়ায় তিনি ডিবিসি ২৪/৭ নিউজকে বলেন, সরকার দেশকে জাহান্নাম বানাতে চায়।

আব্দুর রবের কথা আমলে নিলে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ আসন্ন। ব্যবসায়ীমহল থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণের মাঝে দেশে রাজনৈতিক সংঘাত নিয়ে উৎকন্ঠা আছে। সরকার অবশ্য কোটা প্রথা ফিরিয়ে আনাসহ নানান দাবিদাওয়া আদায়ের স্টেকহোল্ডারদের অন্দোলন করে তা আদায় করার পরামর্শ দিয়েছেন। ইতোপূর্বে সংঘটিত সকল আন্দোলন সরকার সফলভাবে মোকাবেলাও করেছে। সবদিক বিবেচনায় সরকার সুবিধাজনক অবস্থায় আছে। 

এখন রণভূমে ঐক্যফ্রন্ট তথা বিএনপির কৌশল কী হবে? এর আগে ২০১৫ সালে সরকার হঠানোর আন্দোলনে তাদের ভীমের গণমাইর নীতি ব্যর্থ হয়েছে। কপালে জুটেছে আগুন সন্ত্রাস চালানোর তকমা। এবার কী তারা ভীম পুত্র ঘটোৎকচের গণমাইর ও মায়াযুদ্ধের নীতি গ্রহণ করবে? আমরা জানি, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে ঘটোৎকচের আবির্ভাব যুদ্ধের পরিবেশটাই পাল্টিয়ে দেয়। চলমান রাজনীতির রণভূমে ঐক্যফ্রন্ট ঘটোৎকচকে ডেকে আনবে? তারা যদি তা পারে, তা থামিয়ে দেওয়ার মতো কর্ণের একাঘœী অস্ত্রও সরকারের হাতে আছে। 

সেক্ষেত্রে বর্তমান নির্বাচনী তফসিল বাতিল করে অন্য একটি তারিখ ঘোষণা করলেই হলো। এমন নজির অবশ্য আমাদের দেশে আছে। ২০০৮ সালে ড. এটিএম শামসুল হুদার নির্বাচন কমিশন ১৮ ডিসেম্বর নির্বচনের তারিখ দিয়ে তা পরিবর্তন করে ২৯ ডিসেম্বর করেছিল। এছাড়া সংবিধানের ধারা ১২৩ এর ৩(খ) উপ-ধারার সুবিধাতো তাদের কাছে আছেই। সবদিক বিবেচনায় ড. কামাল হোসেন যথার্থই বলেছেন, বল এখন সরকারের কোর্টে।

অনেক হতাশার মধ্যেও আশার কথা হলো, শেষ হওয়া সংলাপে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সকলকে তার উপর আস্থা রাখতে বলেছেন। তিনি কথা দিয়েছেন, একটা ভালো নির্বাচন করে সবাইকে দেখিয়ে দেবেন। জাতির জনকের কন্যা শেখ হাসিনা যা বলেন, তা করে দেখান। এমন ধারণা অনেকের মধ্যেই আছে। তার প্রমাণ তিনি পদ্মা সেতু নির্মান কাজ শুরু করা থেকে অনেক ক্ষেত্রেই দিয়েছেন। এরপরও তাঁর কথায় আস্থা রাখার মতো পরিবেশ কেন তৈরী হচ্ছে না তা বোঝা যাচ্ছে না।

আস্থাহীনতার এই সুযোগে দেশে গণতন্ত্র থাকবে কিনা তা নিয়ে বিএনপির মহাসচিব রাজশাহীর জনসভায় প্রশ্ন তুলেছেন। সাত নভেম্বরের সংলাপ শেষে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিলেন, তারা এক-এগারোর মতো সরকার ডেকে আনতে চাইছে। দেশের বড় দু’টি রাজনৈতিক দলের দ্বিতীয় কর্তাব্যক্তিরা যখন এ ধরণের কথা বলেন তখন সাধারণ জনগণ গণতন্ত্র নিয়ে সংকীত হতেই পারেন।

তবে,‘ডায়ালগ শেষ, আলোচনা চলবে’- ওবায়দুল কাদেরের এই বক্তব্যের মাঝে আপনি সুড়ঙ্গের শেষে আলো দেখতে পারেন। অবশ্য অবস্থা দৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, বড় দুই জোটের কেউই আলোচনার পথ বন্ধ করেননি। সংলাপেই সমাধান- এমনটিই হওয়া উচিৎ। কিন্তু আমাদের রাজনীতিবীদরা এখন পর্যন্ত তা করে দেখাতে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে আমরা আশাবাদী। মানুষ আশায় বাঁচে। আমরা সাধারণ জনগণও আশাকরি, দেশে যুদ্ধক্ষেত্র নয় ভোটযুদ্ধের ক্ষেত্র তৈরী হবে। আমরা কেউই যুদ্ধ বা রণহুঙ্কার চাই না। একটা টেকসই, সহনশীল ও উদার গণতন্ত্র দেখতে চাই। চলমান রাজনীতির মাঠ কোনভাবেই কুরুক্ষেত্র যেন না হয়। সকল পক্ষকে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
      

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

কবিতা

প্রতিদিন কবিতা লিখতে বসে আমি তোমাকে এঁকে ফেলি।   তোমার ছবি তখন আমার সাথে কথা কয়। তখন মায়াপুরিবেলা ভাসতে আর ভাসাতে নেই কোন মানা,   ...